বিএনপি সভাপতি মানিক সওদাগরের দাবি
‘বিমানমন্ত্রী মিল্লাতের নির্দেশেই আওয়ামী লীগে যোগ দেন যুবদল নেতা নজরুল’
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মানিক সওদাগরের বক্তব্য ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বর্তমান জামালপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পরামর্শ ও নির্দেশে তাঁর ছোট ভাই নজরুল ইসলাম সওদাগর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন।
গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বকশীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এ বক্তব্য দেন মানিক সওদাগর। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বিমানমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না।
মানিক সওদাগর তাঁর বক্তব্যে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বকশীগঞ্জ পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম সওদাগর তাঁর লোকবল ও অর্থ দিয়ে তাঁকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি হতে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে নজরুল ইসলাম সওদাগর বিএনপিকে ‘বুকে ধারণ করে’ টিকিয়ে রেখেছেন।
নজরুল ইসলাম সওদাগরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের কঠোরভাবে মোকাবিলার হুঁশিয়ারি দিয়ে মানিক সওদাগর বলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, তাঁদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।
তিনি আরও দাবি করেন, নজরুল ইসলাম সওদাগরকে তিনটি হত্যা মামলায় ষড়যন্ত্র করে আসামি করা হয়েছে। টাকা দিয়ে তাঁকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা নথি উপস্থাপন করা হয়নি।
২০১৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগদানের তথ্য
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম সওদাগর ২০১৫ সালের ১২ জুন তৎকালীন উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম আজাদের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পরে তিনি বকশীগঞ্জ পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক হন।
২০১৯ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বকশীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন নজরুল ইসলাম সওদাগর।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মানিক সওদাগর নিজেও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে তৎকালীন সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মানিক সওদাগরের বক্তব্য জানা যায়নি।
বিএনপির সম্মেলনে নজরুলের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক
২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বকশীগঞ্জের খয়ের উদ্দিন মাদ্রাসা মাঠে উপজেলা ও পৌর বিএনপির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে কয়েকজন সহযোগীসহ নজরুল ইসলাম সওদাগরের উপস্থিতির বিষয়টি সামনে এলে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি নজরুল ইসলাম সওদাগরের গ্রেপ্তারের দাবিতে বকশীগঞ্জ পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। মিছিল শেষে থানায় স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
পরে ১২ আগস্ট রাতে রাজধানীর উত্তরার সাঙ্গাম মোড় এলাকা থেকে উত্তরা পশ্চিম থানা-পুলিশ নজরুল ইসলাম সওদাগরকে গ্রেপ্তার করে। একাধিক মামলায় প্রায় সাত মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মঞ্চে বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির মঞ্চে উপজেলা বিএনপির সভাপতির এমন বক্তব্য স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাবেক যুবলীগ নেতাকে বিএনপিকে টিকিয়ে রাখার কৃতিত্ব দেওয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করায় দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতীতে সম্পৃক্ত ছিলেন-এমন ব্যক্তিদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান এবং তাঁদের ভূমিকা নিয়ে বিএনপির ভেতরেও যে আলোচনা রয়েছে, মানিক সওদাগরের বক্তব্য তা আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
অনুষ্ঠানে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম তালুকদার শাকিলের সঞ্চালনায় প্রধান বক্তা ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম প্রিন্স। বিশেষ অতিথি ছিলেন পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুজ্জামান গামাসহ স্থানীয় বিএনপির নেতারা।
তবে মানিক সওদাগরের বক্তব্য এবং নজরুল ইসলাম সওদাগরের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় বা জেলা পর্যায়ের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।














