প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ২:১১ এম প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

মিঠামইনের ধুবাজোড়া-তেলিখাই গণহত্যায় ২২ শহীদ, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় স্বজনেরা

মোক্তার হোসেন গোলাপ, মিঠামইন।।

১ সেপ্টেম্বর মিঠামইনের ধুবাজোড়া ও তেলিখাই গণহত্যা দিবস

১৯৭১ সালের ১ সেপ্টেম্বর। হাওরজুড়ে তখন বর্ষার থইথই পানি। চারদিকে নিস্তব্ধতা, মানুষের মনে আতঙ্ক। সেই ভোরে কিশোরগঞ্জের তৎকালীন নিকলী থানার ধুবাজোড়া ও ইটনা থানার তেলিখাই গ্রামে নেমে এসেছিল এক বিভীষিকাময় কালো অধ্যায়। স্থানীয় রাজাকার-আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দুই গ্রামে চালায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ।

সেদিন প্রাণ হারান ২২ জন নিরস্ত্র মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী, ছাত্রনেতা ও গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো জনপদ।

কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সেই শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ। জাতীয় পর্যায়ে তাঁদের নাম সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ স্বজন ও স্থানীয় সচেতন মহলের।

ভোরের ঘেরাও, দেড় শতাধিক মানুষ আটক

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। ইটনা, অষ্টগ্রাম ও নিকলী এলাকায় গড়ে ওঠা এসব ক্যাম্পে স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা সহযোগিতা করত।

ধুবাজোড়া গ্রামের হাজি মো. সওদাগর ভূঁইয়ার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে ক্যাম্প স্থাপন করেছেন এমন খবর পৌঁছে যায় ইটনার পাকিস্তানি ক্যাম্পে।

১ সেপ্টেম্বর খুব ভোরে কেওয়ারজোর ইউনিয়নের কান্দিপাড়া গ্রামের রাজাকার কমান্ডার কোরবান আলীর নেতৃত্বে সশস্ত্র রাজাকার ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল ধুবাজোড়া গ্রামের দক্ষিণহাটি ঘেরাও করে। চারদিক থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা গ্রামে প্রবেশ করে।

হাজী মো. সওদাগর ভূঁইয়া, আব্দুল গনি ভূঁইয়া ও রউশন ভূঁইয়ার বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে চালানো হয় তাণ্ডব।

চারদিকে পানি থাকায় গ্রামবাসীর পালানোর সুযোগ ছিল না। ঘেরাও করে আটক করা হয় প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে। চলে নির্যাতন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। পরে তাঁদের মধ্য থেকে বেছে বেছে গ্রামের শিক্ষিত, প্রভাবশালী ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় ইটনা পাকিস্তানি ক্যাম্পে।

সেখানে নির্যাতনের পর তাঁদের হত্যা করে ভয়রা নামক স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে স্থানীয়দের বর্ণনা।

এই অভিযানে গুরুতর আহত হন ইদ্রিস আলী ও মজনু ভূঁইয়া।

যাঁরা সেদিন শহীদ হন

ধুবাজোড়া গ্রামের শহীদদের মধ্যে ছিলেন, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া, আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া, সিদ্দিকুর রহমান ভূঁইয়া এবং আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, যিনি মিঠামইন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

জনপ্রতিনিধি ও আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন, আব্দুল গনি ভূঁইয়া (ইউপি চেয়ারম্যান), রমিজউদ্দিন ভূঁইয়া (ইউপি সচিব) এবং অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন ভূঁইয়া।

ছাত্রনেতা ও তরুণদের মধ্যে শহীদ হন, আবদুর রাশিদ ভূঁইয়া ও রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া (রোকন)।

এ ছাড়া শহীদদের তালিকায় রয়েছেন, আব্দুল মজিদ ভূঁইয়া, আব্দুর রউফ ভূঁইয়া, জহিরউদ্দিন ভূঁইয়া, আবদুল খালেক ভূঁইয়া, নূর আলী ভূঁইয়া, বুধাই ভূঁইয়া, রমজান ভূঁইয়া, আবু জামাল (জাহের), চান্দু মিয়া ও সিরাজ মিয়া।

ধুবাজোড়ার পর তেলিখাই

ধুবাজোড়ায় হত্যাযজ্ঞ ও তাণ্ডব চালানোর পর পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের দলটি যায় তেলিখাই গ্রামের মাথার বাড়িতে। সেখানে আটক করা হয় আরও দুই বিশিষ্ট ব্যক্তি আমির হোসেন ভূঁইয়া ও মুলক হোসেন ভূঁইয়াকে। পরে তাঁদেরও নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।

দুই গ্রামের এসব হত্যাকাণ্ড আজও বয়ে বেড়াচ্ছে শহীদ পরিবারগুলো।

৫৫ বছরেও নেই স্মৃতিচিহ্ন

স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই ২২ শহীদের স্মৃতি আজ যেন বিস্মৃতির অন্ধকারে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ধুবাজোড়া কিংবা তেলিখাইয়ে তাঁদের স্মরণে নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতিফলক, স্মৃতিস্তম্ভ বা শহীদ স্মরণকেন্দ্র।

শহীদ পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচিত হলেও সরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাঁদের অনেকেই চান এই গণহত্যার ইতিহাস রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হোক এবং শহীদদের নাম যথাযথভাবে জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

স্থানীয় সাংবাদিক মোক্তার হোসেন গোলাপ দীর্ঘদিন ধরে লেখনীর মাধ্যমে ধুবাজোড়া ও তেলিখাইয়ের গণহত্যার ইতিহাস এবং শহীদদের স্মৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

দাবি- রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ হোক রক্তাক্ত ইতিহাস

স্থানীয় সচেতন মহল ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের দাবি, অবিলম্বে ধুবাজোড়া ও তেলিখাই গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত স্থানে সরকারি উদ্যোগে স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে ২২ শহীদের নাম যাচাই-বাছাই করে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ ও যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের ভাষায়, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যদি মুক্তিযুদ্ধের একটি গণহত্যার স্থান ও শহীদদের স্মৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত না হয়, তবে নতুন প্রজন্ম জানবে কীভাবে সেই রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ?

ধুবাজোড়া ও তেলিখাইয়ের মানুষের প্রত্যাশা, বিস্মৃতির আড়ালে থাকা ২২ শহীদের নাম এবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদায় ফিরে আসুক।

চেয়ারম্যান: তানভীর হাসান তপু ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: আতিকুল ইসলাম। বার্তাকক্ষ: newsutvbd@gmail.com. কপিরাইট © ইউটিভি বাংলাদেশ সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন