ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং আংশিক কাজ করে পুরো বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার কয়েক বছর আগে নির্মিত স্থাপনা দেখিয়ে নতুন প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের তীর উঠেছে গৌরীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলাল উদ্দিনের দিকে। স্থানীয়দের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের অনেকগুলোর কাজ বাস্তবে হয়নি। অথচ নির্ধারিত সময়ের আগেই এসব প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
সরেজমিনে মেলেনি প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র
স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ৭ থেকে ২০ আগস্ট উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। এ সময় কয়েকটি প্রকল্পে কাজ না হওয়া, নামমাত্র কাজ এবং পুরোনো কাজকে নতুন প্রকল্প হিসেবে দেখানোর অভিযোগ পাওয়া যায়।
রায়গঞ্জ বাজার থেকে কান্দির ঘাট বাজার সড়ক মেরামতে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা এবং নন্দীগ্রাম শামছুলের বাড়ি থেকে রফিকের চায়ের দোকান পর্যন্ত রাস্তার জন্য ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া কলতাপাড়া থেকে গৌরীপুর রাস্তা হয়ে দক্ষিণ দিকে বড়ইতলা রাস্তার আংশিক সলিং ও সংস্কার এবং সাহেব কাচারী সীমান্ত থেকে কাঠবাড়ীর সালামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের প্রকল্প অনুমোদন করা হলেও স্থানীয়দের দাবি, এসব প্রকল্পে বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি।
ময়লাকান্দা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর বাজার এইচবিবি রাস্তা থেকে টিকুরীগামী সড়কে গাইডওয়াল নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং ভেঙা পূর্বপাড়া পাকা রাস্তা থেকে মাদ্রাসা পর্যন্ত এইচবিবিকরণের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে শ্যামগঞ্জ-গৌরীপুর সড়কের গাভীশিমুলা থেকে পূর্ব ভালুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়ে খোদাবক্সের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার জন্য ৩ লাখ টাকা এবং অচিন্তপুর ডেকুরা বাজার সড়কের সিসিকরণের জন্য আরও ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
মাওহা ইউনিয়নের ভাটিয়ারকোনা লালচানের বাড়ি থেকে আহম্মদপুর কামাল মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার জন্য বরাদ্দ ছিল ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে আনুমানিক ৩০ শতাংশ কাজ করেই পুরো বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
পুরোনো গাইডওয়াল দেখিয়ে নতুন বরাদ্দ?
রামগোপালপুর ইউনিয়নের দামগাঁও মোড়লপাড়া জামে মসজিদ থেকে ডাউকী রতনের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার জন্য ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ধুরুয়া বাজার থেকে আগপাড়া চৌরাস্তা পর্যন্ত রাস্তার জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, দুটি প্রকল্পেই নামমাত্র কাজ করা হয়েছে।
এদিকে সিংজানী ভূঁইয়া বাড়ি সার্বজনীন পূজা মন্দিরের পাশে পুকুরপাড়ে গাইডওয়াল নির্মাণের জন্য ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে নতুন করে কাজ করার কোনো চিত্র পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় এক বৃদ্ধের ভিডিও বক্তব্যে দাবি করা হয়, ওই গাইডওয়ালটি প্রায় ৬ থেকে ৭ বছর আগেই নির্মাণ করা হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে সেখানে কোনো কাজ হয়নি। এরপরও পুরোনো স্থাপনাকে নতুন প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী সোয়াদ ও আকাশ ভিডিও বক্তব্যে প্রকল্পগুলোর অনিয়মের অভিযোগ তুলে সরেজমিন তদন্তের দাবি জানান। তাদের ভাষ্য, তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে যাওয়ার কথা ভাবছেন তারা।
ডৌহাখলা এলাকার বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, রাস্তা ও গাইডওয়ালের কাজ না করেই যারা টাকা উত্তোলন করেছেন, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আগের অভিযোগের তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের অনিয়ম এবং সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৪ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়েছিল। তবে ওই অভিযানের তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি পিআইও-ইউএনওর
অভিযোগের বিষয়ে গৌরীপুর উপজেলা পিআইও মোহাম্মদ আলাল উদ্দিন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিয়া আমিন পাপ্পার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরও) মো. রেজাউল করিম সংশ্লিষ্ট ইউএনও ও পিআইওর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, এসব প্রকল্পের বরাদ্দ কিস্তিভিত্তিক আসে। ৩০ জুনের মধ্যে অর্থ ব্যয়ের কথা থাকলেও কিছু অর্থ অবশিষ্ট থাকতে পারে। তবে কোনো কাজ না করেই বিল পরিশোধ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি যাচাই করতে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাকে সরেজমিনে পাঠানো হবে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রকল্পভিত্তিক তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।