শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ ১৪৩২
শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ ১৪৩২

ময়মনসিংহে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টি-ছানা উৎপাদন: প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় চলছে অবৈধ কারখানা

নিজস্ব প্রতিবেদক।। প্রকাশিত: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬, ১২:২০ এম
ময়মনসিংহে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টি-ছানা উৎপাদন: প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় চলছে অবৈধ কারখানা

ময়মনসিংহের খাগডহর ঘুন্টি এলাকায় একটি অবৈধ মিষ্টি ও ছানা তৈরির কারখানাকে ঘিরে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে তা স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকার ওলুর দোকানের পেছনে গড়ে ওঠা এই কারখানাটি কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে কারখানাটি।

এলাকাবাসীর দাবি, ‘শ্যামল’ নামের এক ব্যক্তি কারখানাটির দেখভাল ও পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তবে তিনি কার প্রভাবে বা কীভাবে এ কার্যক্রম চালাচ্ছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, কারখানার মালিক প্রায়ই নিজেকে বিভিন্ন সাংবাদিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে থাকেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি প্রায়ই বলেন, “অমুক সাংবাদিক আমার আত্মীয়, আপনারা কী করবেন?” এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে এলাকাবাসীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। অপরিষ্কার পানিতে দুধ প্রক্রিয়াজাত করা, খোলা জায়গায় দুধ ও ছানা সংরক্ষণ এবং স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে উৎপাদন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এমনকি উৎপাদনস্থলে নেই কোনো স্বাস্থ্যসম্মত সরঞ্জাম বা নিরাপদ সংরক্ষণ ব্যবস্থা। প্রতিদিন এসব খাদ্যপণ্য স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের পরিবেশে তৈরি খাদ্যপণ্য ভোক্তাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য তা আরও বিপজ্জনক হতে পারে।

এ বিষয়ে এলাকাবাসী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সচেতন মহলের দাবি, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দ্রুত অভিযান চালিয়ে অবৈধ এই কারখানা বন্ধসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্রের চরে বালু উত্তোলনকে ঘিরে সংঘর্ষ, গফরগাঁওয়ে পুড়ল ১১ মোটরসাইকেল

গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি।। প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:৩০ পিএম
ব্রহ্মপুত্রের চরে বালু উত্তোলনকে ঘিরে সংঘর্ষ, গফরগাঁওয়ে পুড়ল ১১ মোটরসাইকেল

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের চরে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীর সঙ্গে ছাত্রদল নেতার অনুসারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষের জেরে উত্তেজিত গ্রামবাসী ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ফেলে যাওয়া ১১টি মোটরসাইকেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুরে গফরগাঁও পৌর শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সরকারি কলেজ সংলগ্ন চরআলগী মৌজা ও কলেজ রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা চর এলাকার জমি চরআলগী মৌজার বাসিন্দাদের মালিকানাধীন। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ইজারার মাধ্যমে ওই এলাকা থেকে বালু উত্তোলন চললেও জমির মালিকরা নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে এর আগেও একাধিকবার উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মুক্তার হোসেনের অনুসারীরা চরআলগী মৌজার সাত্তার, বাবুল ও সাদেকের জমিতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করে। এতে জমির মালিকরা বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে স্থানীয় নৌকার মাঝি ওয়াইজ উদ্দিন ওরফে পাবলিককে মারধর করে তার নৌকায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি নদী সাঁতরে তীরে উঠে বিষয়টি গ্রামবাসীকে জানান। এতে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে ছাত্রদল নেতা মুক্তার হোসেনের অনুসারীদের ধাওয়া দিলে তারা মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়।

পরে সরকারি কলেজের সামনের সড়কে ফেলে যাওয়া ১১টি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা।

এ বিষয়ে ছাত্রদল নেতা মুক্তার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

ময়মনসিংহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গফরগাঁও সার্কেল) মনতোষ বিশ্বাস বলেন, “ঘটনার পর থেকে পুলিশ তৎপর রয়েছে। মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এন.এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, খবর পেয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন।

ময়মনসিংহে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা

নিজস্ব প্রতিবেদক।। প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ১১:৪৯ পিএম
ময়মনসিংহে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বৃহস্পতিবার ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্যগণের সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।

এডভোকেট তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ১৪৯ ময়মনসিংহ-৪ সদর আসনের সংসদ সদস্য মোঃ আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার ফারাহ্ শাম্মী, এনডিসি, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক রোকনুজ্জামান রোকন, রেঞ্জ ডিআইজি মোঃ আতাউল কিবরিয়া, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গোলাম মোস্তফা, ময়মনসিংহের চব্বিশে জুলাই শহিদ সাগর এর বাবা মোঃ আসাদুজ্জামান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক মন্ডল প্রমুখ। এতে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুর রহমান। এছাড়াও সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাগণ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যগণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের প্রবীণ ও সাধারণ জনগণ উপস্থিত ছিলেন।

শুরুতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। আলোচনায় মুক্তিযোদ্ধা বক্তারা স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা বেতারে তৎকালীন মেজর জিয়ার ‘উই রিভল্ট’ ঘোষণা শুনে যুদ্ধে গিয়েছিলাম। চট্টগ্রামের হালিশহরে ইপিআরে কর্মরত অবস্থায় ২৫ মার্চ রাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সাধারণ জনগণ এবং ছাত্রদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা শহিদ জিয়ার নেতৃত্বে যুদ্ধ করে এ মাতৃভূমিকে মুক্ত করেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। যে বৈষম্যহীন ও ন্যায় ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিল, সরকার যেন তার পরিপূর্ণ বাস্তবতায়ন করেন।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা এ জাতির সূর্য সন্তান। তাদের এ ঋণ কখনোই ভুলবার নয়। মুক্তিযোদ্ধারা যে আদর্শ বুকে ধারণ করে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, দেশকে সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায় নিতে হলে সবাইকে নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে হলে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বলেন, ১৯৭১ এ যারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তারা কোনো লাভের আশায় যান নি, গিয়েছিলেন স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। বৈষম্য দূর করাট জন্য তারা অনিশ্চিত জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি নয়, বুকে ধারণ করতে হবে। সিটি কর্পোরেশনকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। কোনোভাবেই ময়লাযুক্ত পলিথিন সাততলার উপর থেকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয় নয়। যানজটমুক্ত পরিচ্ছন্ন ময়মনসিংহ নগরী গড়ে তুলতে সকলের সার্বিক সহযোগিতা চাই।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ১৯৭১ সালে ছাত্র জনতা, কৃষক শ্রমিক, সাধারণ জনগণ অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তাদের আত্মত্যাগ ও অবদান কখনোই ভুলবার নয়। এই দেশ, এই স্বাধীনতা ও জাতীয় পতাকা আপনাদের আত্মত্যাগের ফসল। এ স্বাধীনতা ও আত্মত্যাগ তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

প্রধান অতিথি বলেন, মহান স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মুখ সারিতে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তিনি দেশ পরিচালনা করছেন, ইতোমধ্যে দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহারের কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচিসহ একগুচ্ছ কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। আমরা তার এ উন্নয়ন পরিকল্পনায় সহযোগিতা করি। বর্তমান সরকার দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করতে বদ্ধপরিকর।

সভাপতি বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধারা বয়সের ভারে নুঁজ হলেও মনের দিক থেকে চিরতরুণ, বজ্রকন্ঠ। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের সম্পদ। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কেবল স্বাধীনতা দিবস উদযাপন নয়, দায়িত্ব নিয়ে ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বির্নিমানে কাজ করে যেতে হবে। এ সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে অনিয়মের অভিযোগ, কেন্দ্রবিন্দুতে দীপক মজুমদার

স্টাফ রিপোর্টার।। প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬, ৮:২৯ পিএম
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে অনিয়মের অভিযোগ, কেন্দ্রবিন্দুতে দীপক মজুমদার

উন্নয়ন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিষ্ঠানকেই ঘিরে উঠছে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ এখন নগরজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে সিটি কর্পোরেশনের খাদ্য ও স্যানিটেশন কর্মকর্তা দীপক মজুমদার (কমল)। দীর্ঘদিন ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তাকে ঘিরে নানা অভিযোগ নতুন করে সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে কি গড়ে উঠেছে কোনো প্রভাবশালী অনিয়মের বলয়?

প্রশাসনিক সূত্র বলছে, দীপক মজুমদার দীর্ঘ সময় ধরে একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সাধারণভাবে প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দক্ষতা বাড়ানোর কথা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই পদে থাকার সুযোগে একটি শক্ত প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে, যার কারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে।

একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একই জায়গায় দীর্ঘদিন থাকা মানেই সেখানে অঘোষিত একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়া। এতে অনেক সময় সিদ্ধান্ত ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা কমে যায়।”

দীপক মজুমদারকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অতীতেও তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল।

বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় বিদেশি অনুদানে পাওয়া সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং পাচারের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।

সে সময় কোটি টাকার সরঞ্জাম ক্রয় ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠে। তবে সেই অভিযোগের বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

ফলে অভিযোগগুলো সময়ের সঙ্গে চাপা পড়লেও প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে অমীমাংসিত।

সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে উঠা অভিযোগগুলো আরও গুরুতর। অভিযোগ রয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন ও স্যানিটেশন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে ঘুরে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হচ্ছে বাস্তবে কাজের মানের সঙ্গে ব্যয়ের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প আংশিক বাস্তবায়ন হলেও কাগজে পূর্ণ ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে।

একজন ঠিকাদার বলেন, “কিছু প্রকল্পে যে বাজেট দেখানো হয়, বাস্তবে সেই পরিমাণ কাজ করা হয় না। কিন্তু হিসাব কাগজে ঠিকই দেখানো হয়।”

আগেও দুদকের অভিযানে মিলেছিল অনিয়মের প্রমাণ

বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান পরিচালনা করেছিল।

সেসব অভিযানে উঠে এসেছিল, রাস্তা নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ত্রুটি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম

সমস্যাটি কি কোনো একক কর্মকর্তাকে ঘিরে, নাকি পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেই রয়েছে গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা?

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন একই পদে থাকা কর্মকর্তা, দুর্বল তদারকি এবং সীমিত জবাবদিহিতা মিলেই তৈরি হয়েছে একটি অভ্যন্তরীণ চক্র।

একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্প অনুমোদন, ঠিকাদার নির্বাচন, অর্থ ছাড়, ব্যয়ের হিসাব এই সবগুলো পর্যায়েই অস্বচ্ছতা রয়েছে।

যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দুর্নীতি নয় বরং একটি সংগঠিত প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও দীপক মজুমদারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তার এই নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দেওয়ায় জনমনে সন্দেহ আরও বাড়ছে।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হবে বলেও তারা জানিয়েছেন।

তবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, শুধু অভ্যন্তরীণ যাচাই নয়—এই অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

তাদের দাবি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু একজন কর্মকর্তা নয়, সংশ্লিষ্ট পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট পাওয়া এই সিটি কর্পোরেশনকে ঘিরে বারবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা।

অভিযোগগুলো কি সত্যিই তদন্তের মুখ দেখবে, নাকি আগের মতোই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাবে?

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন নিয়ে ওঠা এই অভিযোগ এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং জনস্বার্থের একটি বড় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এই অভিযোগগুলোর সত্যতা কি সামনে আসবে, নাকি আবারও অন্ধকারেই থেকে যাবে পুরো ঘটনা?

(চলবে)