মিঠামইনে আওয়ামী লীগ নেতার রহস্যজনক মৃত্যু
হত্যার দাবি থেকে এখন আত্মহত্যা, বদলে যাচ্ছে পরিবারের ভাষ্য!
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়নের নতুন চাঁনপুর গ্রামে গত ২৬ আগস্ট ভোর সাড়ে ৫টায় যে খবর ছড়িয়ে পড়ে তাতে থমকে যায় এই গ্রামটি। গ্রামের পরিচিত মুখ আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. মুক্তার উদ্দিন (৬২) এর ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায় চাচাতো ভাই এনামুল হকের বসতঘরে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, কয়েকদিন ধরেই এনামুল হক বাড়িতে না থাকায় মুক্তার উদ্দিন ওই ঘরেই রাত কাটাচ্ছিলেন। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে নিজ বাড়ি ফেরার অভ্যাস থাকলেও সেদিন আর ফেরেননি। স্ত্রী মাফুজা আক্তার কলি খুঁজতে গিয়ে স্বামীকে গলায় দড়ি ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এরপরই কান্না ও চিৎকারে জড়ো হন স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুর চড়া ছিল পরিবারের। নিহতের ভাতিজা মো. আইকন মিয়া সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, এটা আত্মহত্যা না। পরিকল্পিত হত্যা। লাশ নামানোর পর শরীরে আঘাতের দাগ ছিল। হত্যা করে ঝুলিয়ে দিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে।
আইকন মিয়া আরও একটি পটভূমি টেনে আনেন। তিনি বলেন, কিছুদিন আগেই মুক্তার উদ্দিন গ্রামে একটি এবতেদায়ী মাদ্রাসার জন্য ঘর তুলেছিলেন। সেই ঘরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরও হয়েছিল। পূর্বশত্রুতার জেরেই এই হত্যাকাণ্ড এমনটাই সন্দেহ তার।
কিন্তু সরেজমিনে কথা বলে জানা গেল ভিন্ন চিত্র। ঘটনার ৪ দিন পার হতেই “হত্যা”র অভিযোগ তোলা পরিবারের ভেতর থেকেই এখন শোনা যাচ্ছে “আত্মহত্যা”র কথা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বলেন, প্রথমে যারা সবচেয়ে জোরে হত্যার কথা বলছিল, তারাই এখন আস্তে আস্তে বলছে পারিবারিক ঝামেলা, মানসিক চাপের কথা। বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
একজন বলেন, যদি সত্যিই হত্যা হয়ে থাকে, তাহলে সন্দেহের তালিকায় পরিবারের লোকজনই আগে আসবে। তাই এখন সবাই একসাথে ‘আত্মহত্যা বলার দিকে যাচ্ছে।
গ্রামে এখন দুই ধরনের আলোচনা। কেউ বলছে রাজনৈতিক ও জমি-মাদ্রাসা নিয়ে বিরোধ, কেউ বলছে পারিবারিক কলহ।
মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ার মাহমুদ জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, এখনই হত্যা বা আত্মহত্যা কোনোটাই নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে সব।
পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং এনামুল হকের বাড়ির আশপাশের লোকজনের বক্তব্য নিয়েছে বলে জানা গেছে।
নতুন চাঁনপুরে এখন থমথমে অবস্থা। মুক্তার উদ্দিন আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন শাখার সহ-সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এছাড়াও জনপ্রতিনিধি হওয়ায়এলাকায় তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বিস্তর। তার মৃত্যুতে শোকের পাশাপাশি আছে আতঙ্ক। লোকজন প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছে না। মুখ খুললেই ঝামেলা। এমন মনোভাব অনেকের।
স্থানীয়রা বলছেন, মাদ্রাসা নিয়ে বিরোধ অনেক পুরনো।তবে এই ঘটনা নিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে কি না তা বলা মুশকিল।
একটি মৃত্যু, দুই রকম বর্ণনা। ২৬ আগস্টের ভোরে শুরু হওয়া এই ঘটনায় পরিবারের শুর “হত্যা” দাবি এবং পরে আত্মহত্যার দিকে ঝোঁক – পুরো বিষয়টিকে আরও ঘোলাটে করেছে।
এখন সব নির্ভর করছে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মুক্তার উদ্দিনের মৃত্যু রহস্যই থেকে যাচ্ছে গোপদিঘীর বাতাসে।











