ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে নানা সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে রোগীকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া এবং চিকিৎসার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ময়মনসিংহে অনুমোদনহীন ও মানহীন ক্লিনিকের বিস্তার এবং রোগী হয়রানির অভিযোগও উঠে এসেছিল।
এবার নগরীর ব্রহ্মপল্লী রোডের একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে এক রোগীকে অস্ত্রোপচারের জন্য নিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার না করেই কেটে সেলাই করার অভিযোগ উঠেছে। রোগীর স্বজনদের দাবি, নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রোপচারের বিষয়ে মৌখিকভাবে আলোচনা হলেও অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার পর তাদের সম্মতি ছাড়াই অস্ত্রোপচারের ধরন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ঘটনাটি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—রোগীর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা নির্ণয়, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা এবং অস্ত্রোপচারের ধরন নির্ধারণে যথাযথ চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
রোগী সোহেলের অভিযোগ
অভিযোগকারী রোগী সোহেল মিয়া (৫৫) গার্মেন্টসকর্মী। তাঁর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে কর্মরত অবস্থায় পিঠ, পাঁজর ও মেরুদণ্ডের পেছনে ব্যথা অনুভব করলে তিনি হালুয়াঘাটের নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। পরে পরিবারের উদ্যোগে গত ২ আগস্ট চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহে আসেন।
পরিবারের দাবি, চিকিৎসক ডা. মনির হোসেন ভূঁইয়ার পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন দেখার পর দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
এরপর গত ১৭ আগস্ট পুনরায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পিত্তথলিতে পাথর ও ছোট আকারের টিউমার রয়েছে বলে জানিয়ে দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরিবারের সঙ্গে চিকিৎসকের মৌখিকভাবে অস্ত্রোপচারের বিষয়ে চুক্তি হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে বদলে গেল পরিকল্পনা?
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, গত ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার থেকে তাঁদের ব্রহ্মপল্লী রোডের এপেক্স ওয়ান শাখায় যেতে বলা হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে সোহেল মিয়াকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, আগে ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারের কথা বলা হলেও অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের অনুমতি ছাড়াই ওপেন সার্জারি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে পরে পিত্তথলিতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় জটিলতা নেই এমন পরিস্থিতি দেখা দেওয়ায় অস্ত্রোপচার না করেই রোগীর শরীরে কাটা দিয়ে সেলাই করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
ঘটনাটি নিয়ে চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মতামত ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর সম্মতি, অস্ত্রোপচারের ধরন, ঝুঁকি এবং প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে জানানো চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রশ্নবিদ্ধ ‘চিকিৎসা ব্যবসা’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে চরপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নগরীর চরপাড়া ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের কিছুতে লাইসেন্স নবায়ন না করা, প্রশিক্ষিত জনবল না থাকা ও রোগী হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়েবসাইটেও রোগীদের দালাল থেকে সতর্ক থাকতে এবং অনিয়ম দেখলে কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই বাস্তবতায় বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে নিয়মিত নজরদারি কতটা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
‘নাম ব্যবহার করে চিকিৎসা’ -অভিযোগ কতটা সত্য?
রোগীর স্বজনদের আরও অভিযোগ, ময়মনসিংহের কয়েকটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে খ্যাতনামা চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে রোগী আকৃষ্ট করা হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি চক্র কাজ করছে বলে তাঁদের দাবি।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিএমডিসি নিবন্ধন, হাসপাতালের লাইসেন্স, অস্ত্রোপচারের নথি, রোগীর সম্মতিপত্র, আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রতিবেদন এবং বিলের কাগজপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
লাইসেন্স ও তদারকি নিয়েও প্রশ্ন
সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের অনলাইন নথিতে ‘Apex Hospital (Pvt.) & Diagnostic Centre’-এর নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যায়; সেখানে লাইসেন্সের মেয়াদ ১১ জানুয়ারি ২০২৪-এ শেষ হওয়ার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। তবে সেটি সংশ্লিষ্ট এপেক্স ওয়ান শাখার বর্তমান লাইসেন্স পরিস্থিতি কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফলে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন, চরপাড়া ও আশপাশে পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বর্তমান লাইসেন্স, চিকিৎসক তালিকা, নার্স-টেকনিশিয়ান, অপারেশন থিয়েটারের অনুমোদন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়মিত যাচাই করা হয় কি না।
জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কবে?
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার, ভুল চিকিৎসা কিংবা রোগীর সম্মতি ছাড়া চিকিৎসা পদ্ধতি পরিবর্তনের অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
এ বিষয়ে রোগী সোহেল মিয়া ও তাঁর পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের বক্তব্য জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীর চিকিৎসা নথি ও অস্ত্রোপচারের কাগজপত্র স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ময়মনসিংহের বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ।।