সনদ জালিয়াতি ও ক্ষমতার দাপটে দনিয়া কলেজে সভাপতির চেয়ারে সাবেক এমপির পুত্র
★ মার্কিন নাগরিকের কাছে জিম্মি শিক্ষক-শিক্ষার্থী
★ বিধি লঙ্ঘনের প্রশ্রয়দাতা খোদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
★ অধ্যক্ষহীন প্রতিষ্ঠানে চলতি দায়িত্বের বিড়ম্বনা
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দনিয়া কলেজ এখন আর জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং পরিণত হয়েছে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে। সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আর ক্ষমতার দাপটে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিতর্কিত উপায়ে নিজের পুত্র ইমরান আহমেদকে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি পদে বসিয়ে রীতিমতো শিক্ষা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী, কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হওয়ার জন্য যে শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন, তা ইমরান আহমেদের নেই বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, এইচএসসি পাসের বিষয়টি নিয়েই যেখানে ধোঁয়াশা রয়েছে, সেখানে তিনি ইবাইস ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জিত বিবিএ ও এমবিএ ডিগ্রির যে সনদ প্রদর্শন করছেন, তা মূলত জালিয়াতির ফসল। এই পুরো প্রক্রিয়াটিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রভাবশালী মহল প্রচ্ছন্ন মদদ দিয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পরিচালক ড. মো: সুলতান মাহমুদ ভূইয়ার স্বাক্ষরিত ইবাইস ইউনিভার্সিটি’র বৈধতা যাচাই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক অনুমতিপত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী ২০১২ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রমের কোন আইনগত ভিত্তি নেই এবং ২০১২ সালের পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত সনদের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। এছাড়াও বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
কলেজের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সভাপতি হওয়ার আগ থেকেই সালাহউদ্দিন ও তার পুত্র কলেজের ম্যানেজিং কমিটিতে থেকে নিজেদের ইচ্ছে মতো ফান্ডের টাকা ব্যয় করেছেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে এই পরিবারটি গড়ে তুলেছে আর্থিক অনিয়মের এক দুর্ভেদ্য দেয়াল।সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজে কলেজের আজীবন দাতা সদস্য হিসেবে পদ অলঙ্কৃত করে রেখেছেন, যা ব্যবহার করে তিনি পুরো কলেজ প্রশাসনকে নিজের হাতের মুঠোয় রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে এডহক কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর গত ২২ জুন,২০২৫ রমিজ উদ্দিন আহমেদকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি নির্বাচন করেন। এই কমিটিতে সালাউদ্দিন আহমেদ দাতা সদস্য এবং উনার ছেলে তানভীর আহমেদ হিতৈষী সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে এই কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রমিজ উদ্দিনকে সভাপতি পদ থেকে গত ০১ এপ্রিল ২০২৬ পদত্যাগে বাধ্য করে ইমরান আহমেদকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দীনের স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ না দিয়ে সমীর হোসেন নামে একজন শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শকের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি দায়িত্বে থাকা কেউ গভর্নিং বডির মিটিং পরিচালনা বা সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। অথচ, সমীর হোসেন গত ৯ মে ২০২৬ তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত গভর্নিং বডির মোট তিনটি সভায় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিধিবহির্ভূতভাবে গভর্নিং বডির সভায় অংশ নেওয়া এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনার সরাসরি লঙ্ঘন। এমনকি গভর্নিং বডির বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কলেজটির গভর্নিং বডি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাপনকে অমান্য করে কেন এবং কোন ক্ষমতাবলে এই কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। পারিবারিক স্বৈরতন্ত্র ও প্রশাসনিক অরাজকতার পেছনে খোদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রহস্যজনক ভূমিকায় দায়ী করছেন অভিভাবক মহল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, সাবেক এমপির প্রভাবেই জালিয়াতির মাধ্যমে এসব সনদ জোগাড় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ইমরান আহমেদের এই শিক্ষাগত যোগ্যতা কেবল জালিয়াতি কাগজেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে যার কোনো প্রতিফলন নেই বলে তারা মনে করছেন। ক্ষমতার দাপট ও আর্থিক অনিয়ম কেবল কলেজ দখল নয়, বরং শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা থেকে বঞ্চিত করে কলেজ ফান্ড থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, কলেজের গভর্নিং বডির বর্তমান সভাপতি ইমরান আহমেদ নিজেই এখন বাংলাদেশে নেই। স্থানীয় ও কলেজ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, গত ১০ জুন তিনি আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন এবং তিনি একজন মার্কিন নাগরিক। প্রশ্ন উঠেছে, একজন স্থায়ী প্রবাসী কীভাবে একটি স্থানীয় কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন?
সচেতন মহল ও শিক্ষকদের প্রশ্ন, যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মের রক্ষক, তারা কীভাবে দনিয়া কলেজের ক্ষেত্রে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে? একদিকে মার্কিন নাগরিক ও প্রবাসীর হাতে কলেজের সভাপতি পদ তুলে দেওয়া, অন্যদিকে নিজস্ব প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে চলতি দায়িত্বে থাকা শিক্ষককে দিয়ে সদস্য সচিবের কাজ করানো, এই সবকিছুই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসনের ধানের শীষের ভরাডুবির পেছনেও সালাহউদ্দিন ও তার দুই পুত্রের এই কর্মকাণ্ডকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় এবং দনিয়া কলেজকে পারিবারিক দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করতে শিক্ষামন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক ও অভিভাবক মহল। তাদের মতে, অবিলম্বে এই কমিটির বিলুপ্তি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সমীর হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি গত ৯ মে ২০২৬ থেকে এ পর্যন্ত তিনটি সভায় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছি। তবে এটি কতটুকু বৈধ বা নিয়মসম্মত, তা আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) ড. এ এস এম আমানুল্লাহ সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সাথে সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ ও তার পুত্র ইমরান আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি।









