সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩

‎সনদ জালিয়াতি ও ক্ষমতার দাপটে দনিয়া কলেজে সভাপতির চেয়ারে সাবেক এমপির পুত্র

মো. আনোয়ার হোসেন।। প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৭ পিএম
‎সনদ জালিয়াতি ও ক্ষমতার দাপটে দনিয়া কলেজে সভাপতির চেয়ারে সাবেক এমপির পুত্র

‎★ মার্কিন নাগরিকের কাছে জিম্মি শিক্ষক-শিক্ষার্থী

‎★ বিধি লঙ্ঘনের প্রশ্রয়দাতা খোদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

‎★ অধ্যক্ষহীন প্রতিষ্ঠানে চলতি দায়িত্বের বিড়ম্বনা

‎রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দনিয়া কলেজ এখন আর জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং পরিণত হয়েছে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে। সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আর ক্ষমতার দাপটে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিতর্কিত উপায়ে নিজের পুত্র ইমরান আহমেদকে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি পদে বসিয়ে রীতিমতো শিক্ষা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

‎জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী, কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হওয়ার জন্য যে শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন, তা ইমরান আহমেদের নেই বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, এইচএসসি পাসের বিষয়টি নিয়েই যেখানে ধোঁয়াশা রয়েছে, সেখানে তিনি ইবাইস ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জিত বিবিএ ও এমবিএ ডিগ্রির যে সনদ প্রদর্শন করছেন, তা মূলত জালিয়াতির ফসল। এই পুরো প্রক্রিয়াটিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রভাবশালী মহল প্রচ্ছন্ন মদদ দিয়েছে।

‎বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পরিচালক ড. মো: সুলতান মাহমুদ ভূইয়ার স্বাক্ষরিত ইবাইস ইউনিভার্সিটি’র বৈধতা যাচাই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক অনুমতিপত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী ২০১২ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রমের কোন আইনগত ভিত্তি নেই এবং ২০১২ সালের পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত সনদের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। এছাড়াও বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।

‎কলেজের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সভাপতি হওয়ার আগ থেকেই সালাহউদ্দিন ও তার পুত্র কলেজের ম্যানেজিং কমিটিতে থেকে নিজেদের ইচ্ছে মতো ফান্ডের টাকা ব্যয় করেছেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে এই পরিবারটি গড়ে তুলেছে আর্থিক অনিয়মের এক দুর্ভেদ্য দেয়াল।সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজে কলেজের আজীবন দাতা সদস্য হিসেবে পদ অলঙ্কৃত করে রেখেছেন, যা ব্যবহার করে তিনি পুরো কলেজ প্রশাসনকে নিজের হাতের মুঠোয় রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে এডহক কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর গত ২২ জুন,২০২৫ রমিজ উদ্দিন আহমেদকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি নির্বাচন করেন। এই কমিটিতে সালাউদ্দিন আহমেদ দাতা সদস্য এবং উনার ছেলে তানভীর আহমেদ হিতৈষী সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে এই কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রমিজ উদ্দিনকে সভাপতি পদ থেকে গত ০১ এপ্রিল ২০২৬ পদত্যাগে বাধ্য করে ইমরান আহমেদকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দীনের স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

‎অনুসন্ধানে জানা যায়, কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ না দিয়ে সমীর হোসেন নামে একজন শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শকের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি দায়িত্বে থাকা কেউ গভর্নিং বডির মিটিং পরিচালনা বা সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। অথচ, সমীর হোসেন গত ৯ মে ২০২৬ তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত গভর্নিং বডির মোট তিনটি সভায় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিধিবহির্ভূতভাবে গভর্নিং বডির সভায় অংশ নেওয়া এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনার সরাসরি লঙ্ঘন। এমনকি গভর্নিং বডির বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কলেজটির গভর্নিং বডি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাপনকে অমান্য করে কেন এবং কোন ক্ষমতাবলে এই কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। পারিবারিক স্বৈরতন্ত্র ও প্রশাসনিক অরাজকতার পেছনে খোদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রহস্যজনক ভূমিকায় দায়ী করছেন অভিভাবক মহল।

‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, সাবেক এমপির প্রভাবেই জালিয়াতির মাধ্যমে এসব সনদ জোগাড় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ইমরান আহমেদের এই শিক্ষাগত যোগ্যতা কেবল জালিয়াতি কাগজেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে যার কোনো প্রতিফলন নেই বলে তারা মনে করছেন। ক্ষমতার দাপট ও আর্থিক অনিয়ম কেবল কলেজ দখল নয়, বরং শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা থেকে বঞ্চিত করে কলেজ ফান্ড থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

‎সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, কলেজের গভর্নিং বডির বর্তমান সভাপতি ইমরান আহমেদ নিজেই এখন বাংলাদেশে নেই। স্থানীয় ও কলেজ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, গত ১০ জুন তিনি আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন এবং তিনি একজন মার্কিন নাগরিক। প্রশ্ন উঠেছে, একজন স্থায়ী প্রবাসী কীভাবে একটি স্থানীয় কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন?

‎সচেতন মহল ও শিক্ষকদের প্রশ্ন, যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মের রক্ষক, তারা কীভাবে দনিয়া কলেজের ক্ষেত্রে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে? একদিকে মার্কিন নাগরিক ও প্রবাসীর হাতে কলেজের সভাপতি পদ তুলে দেওয়া, অন্যদিকে নিজস্ব প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে চলতি দায়িত্বে থাকা শিক্ষককে দিয়ে সদস্য সচিবের কাজ করানো, এই সবকিছুই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

‎স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসনের ধানের শীষের ভরাডুবির পেছনেও সালাহউদ্দিন ও তার দুই পুত্রের এই কর্মকাণ্ডকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় এবং দনিয়া কলেজকে পারিবারিক দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করতে শিক্ষামন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক ও অভিভাবক মহল। তাদের মতে, অবিলম্বে এই কমিটির বিলুপ্তি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে।

‎এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সমীর হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি গত ৯ মে ২০২৬ থেকে এ পর্যন্ত তিনটি সভায় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছি। তবে এটি কতটুকু বৈধ বা নিয়মসম্মত, তা আমার জানা নেই।‎

‎এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) ড. এ এস এম আমানুল্লাহ সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সাথে সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ ও তার পুত্র ইমরান আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি।

বকশীগঞ্জে সংখ্যালঘু দম্পতির স্বর্ণের দোকান দখলের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ।। প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩৫ পিএম
বকশীগঞ্জে সংখ্যালঘু দম্পতির স্বর্ণের দোকান দখলের অভিযোগ

জামালপুরের বকশীগঞ্জ বাজারে এক সংখ্যালঘু দম্পতির মালিকানাধীন স্বর্ণের দোকান জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় শেখ ফরিদ মিয়া ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। দোকানের মালিকের অনুপস্থিতিতে কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে বের করে দিয়ে দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বকশীগঞ্জ বাজারে উৎপল মহন্ত ও তার স্ত্রী সুমি মহন্ত ২০১২ সালে সাফ-কাওলা দলিলের মাধ্যমে ২৬ পয়েন্ট জমি ক্রয় করে সেখানে ‘নিউ মাতৃ জুয়েলার্স’ নামে স্বর্ণের ব্যবসা শুরু করেন। দীর্ঘদিন ধরে ওই দোকানটিই ছিল তাদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।

দোকান মালিকের অভিযোগ, ২০১৩ সালে শেখ ফরিদ মিয়া ও তার সহযোগীরা দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় দোকান ও জমি দখলের একাধিক চেষ্টা করা হয়। পরে তৎকালীন বকশীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ তালুকদার, তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বিজয়, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে দেনদরবার হয় এবং লিখিতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে দাবি তাদের।

তবে অভিযোগ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে শেখ ফরিদ মিয়া ফের পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। দাবি অনুযায়ী টাকা না দেওয়ায় গত ১০ আগস্ট দোকান মালিক উৎপল মহন্তের অনুপস্থিতিতে শেখ ফরিদ মিয়া ও তার সহযোগীরা দোকানে গিয়ে কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে বের করে দেন। পরে দোকানটিতে জোরপূর্বক তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

এখানেই শেষ নয়। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, গত ১৪ আগস্ট ভোরে দোকানের ‘নিউ মাতৃ জুয়েলার্স’ লেখা সাইনবোর্ড রং দিয়ে ঢেকে সেখানে ‘এই দোকান ভাড়া দেওয়া হইবে’ লিখে দেওয়া হয়। পাশাপাশি দোকান ভাড়া দেওয়ার জন্য একটি মোবাইল নম্বরও লিখে দেওয়া হয়।

দোকান মালিকের দাবি, দোকানঘরসহ সংশ্লিষ্ট ভূমি বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংক, বকশীগঞ্জ শাখায় বন্ধক রাখা রয়েছে। ফলে ব্যাংকে বন্ধকীকৃত সম্পত্তিতে এভাবে তালা ঝুলিয়ে দখল ও ভাড়া দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

এ ঘটনায় গত ১৪ আগস্ট জমির যৌথ মালিক ও উৎপল মহন্তের স্ত্রী সুমি মহন্ত বকশীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগটি এখনো মামলা বা এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

সুমি মহন্তের অভিযোগ, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ায় পরিবারের আয়ের প্রধান উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে একদিকে সম্পত্তি ও ব্যবসা হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতা দুই ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন তারা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শেখ ফরিদ মিয়া ও তার সহযোগীদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। একইভাবে বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মকবুল হোসেনের বক্তব্যও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

‎ময়মনসিংহ বিআরটিএতে বেপরোয়া পরিদর্শক বাবর, ঘুষ বাণিজ্য সিন্ডিকেটের গুরুতর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ।। প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:৫৫ এম
‎ময়মনসিংহ বিআরটিএতে বেপরোয়া পরিদর্শক বাবর, ঘুষ বাণিজ্য সিন্ডিকেটের গুরুতর অভিযোগ

‎ময়মনসিংহের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়টি এখন সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের কাছে যেন এক আতঙ্কের নাম। অভিযোগ উঠেছে, এই কার্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে অর্থের বিনিময়ে ফিটনেস সনদ প্রদান, সাধারণ গ্রাহকদের অকারণ হয়রানি এবং দালালনির্ভর সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি সেবাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

‎অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিজস্ব ১০-১৫ সদস্যের একটি চিহ্নিত দালাল চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এই সিন্ডিকেট। অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্রের বাইরে থেকে কোনো সেবা পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি সেবাকেন্দ্রটি যেন সাধারণ মানুষের পরিবর্তে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

‎অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোনো যানবাহন মালিক বা সাধারণ সেবা প্রার্থী নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি আবেদন করলে শুরু হয় নানামুখী হয়রানি। কখনও ছোটখাটো ত্রুটি, আবার কখনও কাল্পনিক অজুহাত দেখিয়ে আবেদনপত্র ফেরত দেওয়া হয়। অথচ অভিযোগ রয়েছে, একই ব্যক্তি যখন জহির উদ্দিন বাবরের ঘনিষ্ঠ দালালদের মাধ্যমে নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করেন, তখন কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই অতি দ্রুত ফিটনেস সনদসহ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।

‎ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, দালাল ছাড়া বিআরটিএতে কোনো ফাইলই নড়ে না।

‎সরকারি নথিতে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ

‎অনুসন্ধানে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, জহির উদ্দিন বাবরের কার্যালয়ের ভেতরে সরকারি নথিপত্র ও সংবেদনশীল ফাইলপত্র নিয়মিতভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করছে বহিরাগত দালাল চক্রের সদস্যরা। যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত, সেখানে পরিদর্শকের টেবিল, ড্রয়ার এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইল পর্যন্ত ব্যবহার করছে বহিরাগতরা।

‎সরকারি দপ্তরের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বিষয়টি এখানে চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।‎

‎যোগদানের পর থেকেই কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

‎স্থানীয় সূত্রের দাবি, ময়মনসিংহ বিআরটিএ কার্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে জহির উদ্দিন বাবরের বিরুদ্ধে। পরিবহন মালিক ও সেবা প্রার্থীদের একটি বড় অংশ দাবি করছেন, ঘুষ ছাড়া এখানে সেবা পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব।

‎অভিযোগের পরও নেই তদন্ত, নেই দৃশ্যমান ব্যবস্থা

‎স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এর আগেও জহির উদ্দিন বাবরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ঘুষ বাণিজ্যের নানা তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় বা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি অভিযোগগুলো যাচাইয়ে কার্যকর তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগও দেখা যায়নি।

‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তাঁর সিন্ডিকেট ধরে নিয়েছে, সংবাদ প্রকাশ হলেও তাদের কিছুই হবে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।

‎এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যম এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

‎তিনি বলেন, আমি সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করছি। দালাল চক্রের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং সরকারি ফাইল বহিরাগতদের স্পর্শ করার সুযোগও নেই।

‎উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি

‎বিআরটিএর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ দেশের সড়ক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

‎ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও পরিবহন মালিকদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তে দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

দুই-তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হবে: ববি হাজ্জাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ।। প্রকাশিত: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪২ পিএম
দুই-তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হবে: ববি হাজ্জাজ

আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ও গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

রোববার (১৬ আগস্ট) ময়মনসিংহে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

‘প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহিতা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি পরিবর্তিত প্রত্যাশা’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করে ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাথমিক শিক্ষার পরিবর্তনে যে স্বপ্ন ও দায়িত্ব দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে সরকার সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের পরিকল্পনা, পাইলটিং ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, কারিকুলাম উন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নতুন শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়ন, মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক শিক্ষা, ক্রীড়া শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন কোনো শিশু যেন শ্রেণিকক্ষের বাইরে না থাকে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিটি প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জন্য পুষ্টিকর মিড-ডে মিল, বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগসহ বিভিন্ন সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ নয়; প্রতিটি বিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের উপযোগী আধুনিক, নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে রূপান্তর করা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে প্রতিটি এলাকার ‘উজ্জ্বল নক্ষত্র’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রাগুলোও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিশ্চিত করেই এসব পরিবর্তন বিদ্যালয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে।

আগামী কারিকুলামে ইংরেজি লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে স্পিকিং টেস্ট চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা কার্যক্রম আরও আধুনিক করতে একটি সমন্বিত আইটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হচ্ছে। এর আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে ইউনিক আইডি থাকবে।

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়নে পৃথক ওয়াশ ব্লকের পরিবর্তে স্কুল ভবনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ওয়াশ ব্লক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্কুল ফিডিং কার্যক্রম নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ কার্যক্রমে যেসব ভুল-ত্রুটি হচ্ছে, তার তুলনায় এ নিয়ে অপপ্রচারই বেশি হচ্ছে। তবে সরকার প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানে কাজ করছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চুরির ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণত মসজিদে এ ধরনের ঘটনা দেখা যায় না। এর অন্যতম কারণ মানুষ মসজিদকে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করে। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অনেকেই নিজের প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করেন না। অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সবার নিজের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষার বিভাগীয় উপপরিচালক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) মহাপরিচালক ফরিদ আহমেদ এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশনসের পরিচালক।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলার পিটিআই সুপার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন।