ময়মনসিংহের দাপুনিয়া ভূমি অফিসে ঘুষের রাজত্ব, সেবাগ্রহীতাদের চরম ভোগান্তি
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জমির খাজনা পরিশোধ থেকে শুরু করে নামজারি পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি দাপ্তরিক কাজেই ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে নামজারি (মিউটেশন) প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এই দপ্তরে দালালদের মধ্যস্থতা ছাড়া কোনো কাজই এগোয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি ফাইলের ওপর দালালদের সঙ্গে করা চুক্তির বিশেষ ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে আবেদন বাতিল করে দেন। ফলে সাধারণ মানুষকে একদিকে যেমন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পোহাতে হচ্ছে দীর্ঘ ভোগান্তি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইনে আবেদন করার পর ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। নির্দিষ্ট দালাল না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি আবেদনকারীর সঙ্গেও অর্থের চুক্তি করা হয়। চুক্তি সম্পন্ন হলে ফাইলের ওপর বিশেষ চিহ্ন দেওয়া হয়, যা দেখে পরবর্তী ধাপের কর্মকর্তারা ফাইলটি দ্রুত অগ্রসর করেন।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, প্রতিদিন অফিস সময় শেষে বিশেষ চিহ্নযুক্ত ফাইলের হিসাব অনুযায়ী ঘুষের টাকা লেনদেন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ভূমি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম সরাসরি এই চুক্তিতে জড়িত থাকেন। যারা এই অনৈতিক চুক্তিতে রাজি হন না, তাদের আবেদন নানা ত্রুটি দেখিয়ে বাতিল করে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এই দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
ইউনিয়নের কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, নামজারি করাতে তাদের ভূমি কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমি জমির নামজারি করতে সব কাগজপত্র ঠিকঠাক দিয়েছি। কিন্তু টাকা না দিলে কোনো কাজ এগোয় না। কয়েক মাস ধরে ঘুরছি, এখনো ফাইল এগোয়নি।”
অভিযোগ রয়েছে, অফিস টাইম শেষে নির্দিষ্ট দালালদের নিয়ে রাত পর্যন্ত চলে অবৈধ লেনদেনের হিসাব-নিকাশ। দালাল সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে সেবা নিতে চাইলে সেবাগ্রহীতাদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি চাহিদামতো ঘুষ না দিলে দীর্ঘদিনেও ফাইল টেবিল থেকে নড়ে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রতিটি নামজারি খারিজের নথির পেছনে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এছাড়া মিসকেস, ১৪৪ ধারাসহ বিভিন্ন মামলার প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, খাজনা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করা হচ্ছে। নায়েব শফিকুল ইসলাম ইচ্ছামতো বেশি খাজনা নির্ধারণ করলেও পরে অতিরিক্ত টাকা দিলে তা কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটি মিউটেশনের সরকারি ফি প্রায় ১,১৭০ টাকা হলেও দাপুনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে মিউটেশনের জন্য ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসিল্যান্ডের নাম ভাঙিয়ে এই টাকা আদায় করা হয়।
স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা জানান, জমির নামজারি, খতিয়ান দেখা, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা খাজনা আদায় প্রতিটি ধাপেই অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। ফলে প্রতিদিন অনেক মানুষকে অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে দাপুনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলে ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
স্থানীয়দের দাবি, দাপুনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এই দুর্নীতি বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।











