কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার উলামা লীগের সভাপতি ও চমকপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলী খন্দকারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় সিআইডির তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওলামা লীগের মিঠামইন উপজেলা শাখার সভাপতি ইয়াকুব আলী খন্দকার চমকপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। এরপর থেকে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্বে থেকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে মাদ্রাসার লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিগত ২০২৫ সালে মুরশিদুল আলম মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ইয়াকুব আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের বিভিন্ন তথ্য সামনে আসে। পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুরশিদুল আলম বাদী হয়ে অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলী খন্দকার ও সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কোরবান আলীকে বিবাদী করে কিশোরগঞ্জের ৪ নম্বর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমল গ্রহণকারী আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর:- সিআর ৫৩৯/২০২৫।

আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সিআইডির এসআই মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তিনি আদালতে ২৭৭ পাতার একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইয়াকুব আলী খন্দকার অধ্যক্ষ এবং তার সহযোগী হিসেবে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কোরবান আলী দায়িত্ব পালনকালে মাদ্রাসার তহবিল থেকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন। এছাড়া মাদ্রাসা উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ‘সম্মানী’ বা ঘুষ প্রদানের কথা বলে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম তার প্রতিবেদনে ইয়াকুব আলী খন্দকার ও কোরবান আলীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৩, ৪০৬, ৪২০ ও ৩৪ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে আদালতে উল্লেখ করেন।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চমকপুর গ্রামের হুমায়ুন কবির ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তৎকালীন কর্মকর্তা শাজাহান সিরাজকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন।
এছাড়া অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলীর বিরুদ্ধে স্থানীয় বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুর এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি পোড়ানোর অভিযোগেও মামলা রয়েছে। মিঠামইন থানার মামলা নম্বর–২, তারিখ ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪। ওই মামলায় পুলিশ তাকে ঘাগড়া বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুরশিদুল আলম এ প্রতিবেদককে জানান, ইয়াকুব আলী অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মাদ্রাসায় দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করার পর মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার দাবি, ইয়াকুব আলী ও সাবেক সভাপতি কোরবান আলী দুর্নীতির মাধ্যমে মাদ্রাসার প্রায় ৩০ লাখ টাকা লুটপাট করেছেন। একই সঙ্গে একটি মহল পুরো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঘাগড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী, জিয়া সাইবার ফোর্স কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক তফসির খান এবং ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য আব্দুর রউফ মেম্বার বলেন, হেলিম মাওলানার উদ্যোগ ও চমকপুর গ্রামবাসীর সহযোগিতায় মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমানে নেতৃত্ব ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষার মানকে নিম্নমুখী করছে। তারা দলাদলি নিরসন করে শিক্ষার মান উন্নয়নে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলী খন্দকার বলেন, “ঘটনাটি নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিএনপি অফিস ভাঙচুরের অভিযোগও মিথ্যা। আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।”