ময়মনসিংহে মাদকের বিস্তার, বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা; উদ্বেগে নগরবাসী
ময়মনসিংহে আশঙ্কাজনক হারে মাদক প্রবেশ ও বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধ বিশ্লেষক ও চিকিৎসকদের মতে, মাদকাসক্তির বিস্তার কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, শহরের পাটগুদাম, কৃষ্টপুর, মেডিকেল গেইট, বাঘমারা, পুরোহিতপাড়া, মালগুদাম, চরপাড়ার নয়াপাড়া, আকুয়া ভাঙাপুল ও সানকিপাড়ার জামতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্র, ছুরি ও চাকু দেখা যায় এবং তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিছু ঘটনায় সহিংসতা ও নৃশংসতার অভিযোগও রয়েছে, যা নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সন্ধ্যার পর শহরের কিছু স্পর্শকাতর এলাকাসহ ময়মনসিংহ পতিতাপল্লী সংলগ্ন এলাকাতেও কিশোর গ্যাং সদস্যদের আনাগোনা দেখা যায়। বিভিন্ন এলাকা থেকে দলবদ্ধভাবে সেখানে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। এদের একটি অংশ অস্ত্র বহন ও মাদকসেবনের সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক কিশোরদের মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যাদের হাতে বই থাকার কথা, তাদের একটি অংশ মাদক পরিবহন ও বিক্রির মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, কথিত ‘বড়ভাই’, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া কিংবা বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এসব কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক নিয়মিত সেবনের ফলে কিশোর ও তরুণদের আবেগ, সহমর্মিতা ও মানবিকতা কমে যায়। তারা ক্রমশ সহিংস ও নিয়ন্ত্রণহীন আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সূত্রমতে, ১৪ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের একটি অংশ ইয়াবা ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। শহরের মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতেও এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এলাকার প্রভাবশালীদের হয়ে মাদক বিক্রি করতে গিয়ে অনেক কিশোর প্রথমে এ চক্রে জড়িয়ে পড়ে এবং পরে নিজেরাই মাদকাসক্ত হয়ে যায়। বিনামূল্যে মাদক পাওয়ার সুযোগও তাদের দ্রুত এই পথে টেনে নেয়। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন মাদকাসক্ত থাকলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে মাদক ও কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার নিয়মিত অভিযানের পরও দৃশ্যমানভাবে অপরাধ কমেনি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাদের মতে, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক অপরাধী প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার মতে, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের প্রবেশ বন্ধ করা না গেলে কার্যকরভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নগরের কিছু এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে শহরের কয়েকটি এলাকা মাদক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও শিক্ষামুখী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
















