ব্রিজের নিচে ঝুলছে পিস্তল, মোবাইলে লোকেশন: ময়মনসিংহে অস্ত্র কেনাবেচার ভয়ংকর নেটওয়ার্ক
ময়মনসিংহ নগরী ও ভালুকা উপজেলাসহ আশপাশের এলাকায় কিস্তিতে আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির ভয়ংকর প্রবণতা এখন জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ পিস্তল, রিভলভারসহ নানা ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে এই অস্ত্র সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে কিশোর-তরুণ এমনকি স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হাতে।
এই অবাধ অস্ত্রপ্রবাহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে একের পর এক কিশোর গ্যাং। নগরীর বিভিন্ন অলিগলি এখন কার্যত গ্যাং নিয়ন্ত্রিত এলাকা। প্রকাশ্যে অস্ত্রের ঝনঝনানি, গোলাগুলি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় পুরো ময়মনসিংহবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নগরীর ঐতিহ্যবাহী আকুয়া মহল্লাসহ একাধিক এলাকা সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে। মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের অবাধ বিচরণে এসব এলাকা এখন গ্যাং স্পটে রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর উত্থান ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায়। কিন্তু ভয় ও আতঙ্কের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ প্রতিবাদ বা মামলা করতে গেলে বাড়িতে ঢুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যা ও গুমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া ছাড়াও নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুরের সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ঢুকছে নগরীতে। এসব অস্ত্রের মধ্যে ‘মেইড ইন ইউএসএ’ লেখা পিস্তল ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ভারতের তৈরি ‘ফাইভ স্টার’ পিস্তলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
অস্ত্র ব্যবসায়ীদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, চোরাচালানে আসা অস্ত্রের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা নগণ্য। একসময় র্যাব, পুলিশ ও ডিবির নিয়মিত অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হলেও বর্তমানে সেই অভিযান কার্যত শূন্য কোটায় নেমে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য জানান, অস্ত্র কেনাবেচায় দালালরা মূল ভূমিকা পালন করছে। দালালের মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতার যোগাযোগ স্থাপন হয়। টাকা পরিশোধের পর মোবাইল ফোনে জানিয়ে দেওয়া হয়—কোনো ব্রিজের নিচে, গাছের ডালে কিংবা নির্জন স্থানে ঝুলিয়ে রাখা আছে অস্ত্র। সেখান থেকেই ক্রেতাকে সংগ্রহ করতে হয়।
সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অস্ত্রবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তার, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ভাড়াটে খুনে এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক সময় গ্রেপ্তারের পর প্রভাবশালী ‘বড় ভাইদের’ নাম বলেই জামিনে বেরিয়ে আসছে সন্ত্রাসীরা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাচিঝুলীমোড়, ইটাখোলা, আনন্দমোহন কলেজ রোড, টাউনহল মোড়, সানকিপাড়া রেলক্রসিং, জিলা স্কুল মোড় ও আশপাশের গলি, আকুয়া ভাঙ্গাপুল, বাইপাস মোড়, পুলিশ লাইন, বাকৃবি এলাকা, কেওয়াটখালি, পাটগুদাম ব্রিজমোড়, শম্ভুগঞ্জ, কালিবাড়ী, চরপাড়া, মাসকান্দা ও ছত্রিশবাড়ী কলোনিসহ নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই অস্ত্রবাজ গ্রুপের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।
সচেতন মহলের স্পষ্ট দাবি, অবিলম্বে সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে অস্ত্রের এই অবাধ প্রবাহ বন্ধ না করা হলে ময়মনসিংহ অচিরেই ভয়াবহ সন্ত্রাসের নগরীতে পরিণত হবে।












