সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ পৌষ ১৪৩২
সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ পৌষ ১৪৩২

কাগজে প্রকল্প–হাতে টাকা! মসিকের স্বাস্থ্য খাতে গুরু-শিষ্যের ১৫ কোটি টাকার লুটপাট

শিবলী সাদিক খান।। প্রকাশিত: বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৯:১০ পিএম
কাগজে প্রকল্প–হাতে টাকা! মসিকের স্বাস্থ্য খাতে গুরু-শিষ্যের ১৫ কোটি টাকার লুটপাট

দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন (মসিক)। কাগজে কলমে প্রকল্প দেখিয়ে নয়ছয় করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, মসিকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত বছরের পাঁচ আগস্টের পর সাত-আট মাস চুপ থাকলেও এ বছরের মে মাস থেকে তারা আগের চরিত্রে ফিরে গেছেন। পিছিয়ে নেই আলোচিত স্বাস্থ্য বিভাগ। এ বিভাগে গুরু-শিষ্যের অনিয়ম-দুর্নীতি অতিতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলেও রহস্যজনক কারণে পার পেয়ে যাচ্ছেন মেডিকেল অফিসার ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথ (এইচকে দেবনাথ) ও স্বাস্থ্য সহকারী সাইফুল ইসলাম (সাজু)। এদের জ্বালায় অতিষ্ঠ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবকরা। গুরু-শিষ্য মসিক থেকে ছয় বছরে ১৫ কোটি টাকা লুটপাট করেছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানা যায়, মেডিকেল অফিসার ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথ মসিকের স্বাস্থ্য বিভাগে লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি নানা বিষয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। শিষ্য স্বাস্থ্য সহকারী সাইফুল ইসলাম তাকে সহযোগিতা করেন। জাতীয় পরিচয়পত্র (৯১২০৭৬৩৯০০) ও চাকরির ব্যক্তিগত নথিতে হরে কৃঞ্চ দেবনাথ নাম থাকলেও নিজের নামের একাংশ পাল্টে এইচকে দেবনাথ রেখেছেন। অফিসের সিল, প্যাড, নেমপ্লেট, বিল-ভাউচার, চিঠি আদান-প্রদান ও মসিকের হিসাব বিভাগ থেকে বানানো নামে চেক গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালে ময়মনসিংহ পৌরসভায় (সিটি করপোরেশন) যোগদানের পর থেকেই তিনি নাম জালিয়াতি করে যাচ্ছেন। বিষয়টি জালিয়াতি বলে উল্লেখ করেছেন ট্রেজারী কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন মেডিকেল অফিসার ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথ। ভুল তথ্য দিয়ে অবৈধ পন্থায় ২০২৩ সালের মার্চ মাসে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট নেন। তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলীর স্বাক্ষর করা ০৫-০৩-২০২৩ তারিখের মসিক/প্রশা/সাধা/২৩/৩৮৩ স্মারকে পাসপোর্ট অফিসে এনওসি পাঠানো হয়। এতে তিনি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পরিচয় দেন। ওই সময় তিনি ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ চলতি দায়িত্বে থাকলেও এনওসিতে তা উল্লেখ করেননি। তা ছাড়া ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার বাসার ঠিকানা না দিয়ে পাসপোর্টের আবেদনে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ঠিকানা ব্যবহার করেন। পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।

জানা যায়, গুরু-শিষ্যের কাছে মসিকের স্বাস্থ্য বিভাগ জিম্মি হয়ে পড়েছে। সম্মানি ও ‘হিস্যা’ নিয়ে কর্মচারী, স্বেচ্ছাসেবক ও গণমাধ্যকর্মীদের সঙ্গে বিরোধ ও তর্কবিতর্ক হয়। বিভিন্ন টিকা ও ক্যাপসুল খাওয়ানো কর্মসূচিকে পুঁজি করে সরকারি ও মসিকের তহবিল থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় লাখ লাখ টাকা। টিকাদান কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মানি মেরে দিয়েও গুরু-শিষ্য আলোচনায়। সূত্র মতে, মসিকের স্বাস্থ্য খাতে লুটপাট হওয়া ১৫ কোটি টাকার মধ্যে করোনার আড়াই বছরে আট কোটি, গত ছয় বছরের বিভিন্ন সময়ে চার কোটি, নগর মাতৃসদন ও নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে তিন কোটি টাকা লুটপাট করা হয়। লুটপাটের টাকায় ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথ কিশোরগঞ্জে জমি ও ঢাকার মোহাম্মদপুরে ফ্ল্যাট কেনা ছাড়াও নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন। স্বাস্থ্য সহকারী সাইফুল ইসলাম (সাজু) ময়মনসিংহ নগরীতে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাসহ গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জে বিপুল জমি কিনেছেন।

সূত্র জানায়, ২০২০ সালে করোনা শুরু হওয়ার পরই টাকা লুটপাট করতে মাঠে নামেন আলোচিত গুরু-শিষ্য। তারা মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ভুল বুঝিয়ে কোটি কোটি টাকার সুরক্ষা সামগ্রী কিনতে থাকেন।

করোনার সময় পর্যায়ক্রমে পাঁচ কোটি টাকার পিপিই, মাক্স, স্যানিটাইজারসহ অন্যান্য পণ্য ক্রয় দেখানো হয়। সাইফুল ইসলাম (সাজু) পাঁচ কোটি টাকার মালামাল কিনে একাই তিন কোটি আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া গত ছয় বছরে বিভিন্ন ফাইল ও জন্মনিবন্ধন থেকে ‘ধুরন্ধর’ সাজু আরো দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। একই সময় মেডিকেল অফিসার ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথ করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রম, বিভিন্ন টিকা ও ক্যাপসুল খাওয়ানো কর্মসূচি থেকে চার কোটি এবং নগর মাতৃসদন ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র খাত থেকে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

আলোচিত গুরু-শিষ্য, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ও তাদের প্রতিনিধির নামে গত ছয় বছরে হিসাব বিভাগ থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকার চেক ইস্যু হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। তার মধ্যে সাইফুল ইসলামের একার নামেই ইস্যু হয়েছে চার কোটি টাকার চেক। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গুরুসহ তাদের লোকজনের নামে বাকি টাকার চেক ইস্যু হয়। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে কয়েকজন উচ্চমান সহকারী ও নিম্নমান সহকারী থাকলেও কাউকেই স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয় না। টাকা হাতানোর গোমর ফাঁস হওয়ার ভয়ে শিষ্য সাইফুল ইসলাম একাই সব কিছু সামলান। বছর খানেক আগে এ নিয়ে গুঞ্জন শুরু হলে নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক মো. ওয়ালিউল ইসলামকে স্বাস্থ্য বিভাগে বদলি করা হয়। ‘ধুরন্ধর’ গুরু-শিষ্যের চক্রান্তে টিকতে না পেরে তিনি অন্য শাখায় ফিরে যান।

জানা যায়, মেডিকেল অফিসার ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথের টাকা হাতানোর উৎস একটি মাতৃসদন ও তিনটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বাঘমারায় নগর মাতৃসদন, খাগডহর, গোলকীবাড়ি ও শম্ভুগঞ্জে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র। চারটি কেন্দ্রে সাতজন ডাক্তার, ১২ জন প্যারামেডিক ও ৮১ জন স্টাফ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। চারজন ডাক্তার, চারজন প্যারামেডিক ও ৫০ জন স্টাফ দিয়ে চলছে চারটি কেন্দ্র। এ খাতে বিল-ভাউচার করে প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। মাসে গড়ে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র মতে, এডিবির অর্থায়নে ‘আরবান হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারী প্রজেক্ট-২’ ২০২২ সালের জুন মাসে দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প শুরু করে। ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে মন্ত্রণালয় ও মসিকের অর্থায়নে প্রকল্পটি চালু রাখা হয়েছে। এর মেয়াদ চলতি ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। মন্ত্রণালয়, মসিক ও পিএসটিসি এনজিও টাকার জোগান দেওয়ার কথা।

সূত্র জানায়, পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি) এনজিও কেন্দ্রগুলো দেখভাল করার কথা। মসিকের মেডিকেল অফিসার ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথ প্রকল্পের প্রোগ্রাম অফিসার ও পিএসটিসি’র ইকবাল হোসেন প্রজেক্ট ম্যানেজার। সব কিছুই মেডিকেল অফিসার ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথের নিয়ন্ত্রণে। তাকে ছাড়া হয় না নিয়োগ ও কেনাকাটা। চারটি কেন্দ্রে নিয়োগ করা কর্মীদের কাছ থেকেও টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র মতে, মাতৃসদন ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র নগরবাসীর কোনো কাজে আসছে না। কোনো নাগরিক চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা পেয়েছেন এমন নজির নেই। কেন্দ্রের চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষার সামগ্রী ও অন্যান্য মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্ক হাতিয়ে নেন মেডিকেল অফিসার ডা. হরে কৃঞ্চ দেবনাথ। ব্যহত হচ্ছে ভিটামিন এ প্লাস, কৃমি নাশক ও টাইফয়েডের মতো জীবনরক্ষাকারী টিকাদান কর্মসূচি। নয়ছয় করেন এ সব খাতের অধিকাংশ টাকা। তার বিরুদ্ধে সম্মানি আত্মসাতের অভিযোগে কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবকরা বিক্ষোভ করেন।

গুরু-শিষ্যের অভিযোগ সম্পর্কে মসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ গতকাল রোববার রাতে একটি দৈনিক পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিযোগ তদন্ত করে দোষীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোনো অবস্থাতেই তারা ছাড় পাবেন না।

অপরদিকে মসিকের কঞ্চন নন্দি, লাইসেন্স পরিদর্শক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সহ বেশ কয়েকজন এর বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

ত্রিশালে কাগজে প্রকল্প; মাঠে নেই অস্তিত্ব! পিআইও শহিদুল্লাহ’র বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ

শিবলী সাদিক খান, ময়মনসিংহ।। প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১২:২৬ পিএম
ত্রিশালে কাগজে প্রকল্প; মাঠে নেই অস্তিত্ব! পিআইও শহিদুল্লাহ’র বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ১০নং মঠবাড়ী ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়াবহ অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কাগজে প্রকল্প মাঠে নেই অস্তিত্ব! এমন জোরালো আলোচনা সমালোচনার কারণেই

জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছে মটবাড়ী ইউনিয়নের ২৮ টি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজন।

জানা যায়, ‎২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে বরাদ্দ পাওয়া মোট ২৮টি উন্নয়ন প্রকল্প নামের সংশ্লিষ্ট এলাকায় (মাঠপর্যায়ে) কোনো কাজ না করেই কাগজে-কলমে সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় ৭৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

‎এ ঘটনায় স্থানীয়দের পক্ষে মো. বাবুল মিয়া দুদক চেয়ারম্যান বরাবর বিস্তারিত উল্লেখ করে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ, বাস্তব অবস্থা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকার তথ্য সংযুক্ত রয়েছে।

‎কাগজে প্রকল্প, মাঠে নেই অস্তিত্ব! অভিযোগ অনুযায়ী, মঠবাড়ী ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে রাস্তা সংস্কার, ড্রেন, কালভার্ট, মাটি ভরাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরেজমিনে কোনো কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

‎স্থানীয়দের দাবি যেসব প্রকল্প কাগজে শতভাগ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে, বাস্তবে সেসব স্থানে বছরের পর বছর কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। ডিজিটাল তথ্য বোর্ডে প্রকল্পের নাম থাকলেও মাঠে কাজের চিহ্ন না থাকায় প্রকল্প অনুমোদন ও বিল ছাড় প্রক্রিয়া নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠেছে।

ত্রিশাল উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ত্রিশাল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ। স্থানীয়দের অভিযোগ মটবাড়ী ইউনিয়নে কোন কাজ না করেই সরকারি অর্থ তছরুপ করা হয়েছে, প্রকল্প যাচাই, কাজের সমাপ্তি সনদ প্রদান এবং বিল ছাড়ের প্রতিটি ধাপেই তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অন্যান্য ইউনিয়নে হয়তো কিছু কাজ করছে, নয়তো প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বরাদ্দের অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করে এলাকার জনগণকে উন্নয়ন বঞ্চিত করেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানান‎,“মাঠপর্যায়ে কাজ না হলে কোনোভাবেই বিল পাস হওয়ার সুযোগ নেই। বরাদ্দকৃত অর্থ সরকারের কোষাগারে ফেরত যাওয়ার বিধিবিধান রয়েছে। পিআইও প্রকল্পের যাচাই বাছাই কাজের মান নির্ণয় পুরো ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক।”

‎জানা যায়, নানা অভিযোগের ভিত্তিতে পিআইও মোহাম্মদ শহিদুল্লাহকে সম্প্রতি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন এই বদলি কি শাস্তি, নাকি দায় এড়ানোর কৌশল?

ত্রিশাল উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে গত কয়েক বছরের টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা তা পূর্ণাঙ্গভাবে অডিট করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

অভিযুক্ত পিআইও মোহাম্মদ শহিদুল্লাহকে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গুলো ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সব প্রকল্প সরকারি বিধি-বিধান মেনেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে আমি জড়িত নই। কেউ ব্যক্তিস্বার্থে আমাকে হয়রানি করতে এসব অভিযোগ তুলেছে। তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।”

খাদ্য কর্মকর্তা শহীদুল্লাহর কোটি টাকা অস্বাভাবিক লেনদেন; চাল সংগ্রহ ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে মামলা

শিবলী সাদিক খান, ময়মনসিংহ।। প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:০৩ এম
খাদ্য কর্মকর্তা শহীদুল্লাহর কোটি টাকা অস্বাভাবিক লেনদেন; চাল সংগ্রহ ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে মামলা

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক ও সরকারি খাদ্য গুদামের (এলএসডি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চাল সংগ্রহ ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে। অভিযোগ ওঠার পর তাকে দিনাজপুরের বিরামপুরে বদলি করা হয়েছে।

চালকল মালিক নাসির উদ্দিন লাল বাদী হয়ে সম্প্রতি আদালতে মামলাটি করেন। তার অভিযোগ, শহীদুল্লাহ নিম্নমানের চাল গুদামজাত করা, সরবরাহকারীদের বিল আত্মসাৎ ও ঘুষের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

মামলার বাদী নাসির উদ্দিন লাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারি তালিকায় শামীম এন্টারপ্রাইজ নামে কোনো চালকল নেই। অথচ শহীদুল্লাহ নিয়মবহির্ভূতভাবে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে আমার সরবরাহ করা ১০ টন চালের বিল তুলে নেন। এর আগে গত আমন মৌসুমেও তিনি আমার তিন লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ করেন।’ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হন বলে জানান তিনি।

খাদ্য বিভাগের সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে রৌমারীতে যোগদানের পর থেকেই শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর আগেও তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার যাদুরানী খাদ্য গুদামে দায়িত্ব পালনকালে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন।

অনুসন্ধানে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর দুটি ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য মিলেছে। তার সোনালী ব্যাংক রৌমারী শাখার ব্যক্তিগত হিসাবে চলতি বছরের ২৫ মে থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত প্রায় ৮২ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলন করা হয়েছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহের সোনালী ব্যাংকের আরেকটি হিসাবে ১ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যার টাকা রৌমারী ও কুড়িগ্রাম শহর থেকে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে নিম্নমানের চাল বিতরণের অভিযোগে সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে কয়েকটি ডিলার পয়েন্টে এর সত্যতা মেলে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় জনতা সরকারি গুদাম থেকে বের করার সময় দুই ট্রাক নিম্নমানের চাল আটক করে। স্থানীয় চাল ব্যবসায়ী ছকমল হোসেন বলেন, ‘সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এ ধরনের দুর্নীতি সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রথমে গণমাধ্যম কে বলেন ‘বিষয়টি তদন্তাধীন’ বলে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পরে ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, ‘রৌমারী থেকে আমার চাচাতো ভাই গরু কিনে নিয়ে যান। সেই টাকার লেনদেন আমার হিসাবে হয়েছে। সরকারি কর্মচারী হিসেবে এটা ঠিক হয়নি, তবে এর বাইরে কিছু নয়।’ ময়মনসিংহ শাখার হিসাবে কোটি টাকার লেনদেনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়েরা বিভিন্ন ব্যবসা করেন, তারা আমার হিসাব নম্বর ব্যবহার করে লেনদেন করেছেন।’

তবে তার ব্যাংক হিসাবে কুড়িগ্রাম ও রৌমারী থেকে কেন টাকা পাঠানো হয়েছে? এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি চুপ করে থাকেন। কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হামিদুল হক জানান, ‘অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি গত রোববার থেকে তদন্ত শুরু করেছে। আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, অভিযোগ ওঠার কারণেই তাকে রৌমারী থেকে বদলি করা হয়েছে।

ময়মনসিংহে হেলে পড়েছে ৫ তলা ভবন

ইউটিভি ডেস্ক রিপোর্ট।। প্রকাশিত: রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:২৪ পিএম
ময়মনসিংহে হেলে পড়েছে ৫ তলা ভবন

ময়মনসিংহ নগরীতে একটি ৫ তলা ভবন হেলে পড়েছে। এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় তাৎক্ষণিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বাসিন্দাদের। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে তোলপাড় শুরু হলে উৎসুক জনতা ভবনটির আশপাশে ভিড় করেন।

শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) রাত ৮টার দিকে নগরীর গোলকিবাড়ী বাইলেন কাজী অফিস সংলগ্ন এলাকার এ ভবনটি হেলে পড়ার খবর পাওয়া যায়।

এর আগে বিকেল ৫টার দিকে হেলে পড়া ভবনটির দেয়ালে ফাটল রেখা ও সামনের অংশের মাটিতে দৃশ্যমান ফাটলের সৃষ্টি হয়। ভবনের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম ঘটনাটি ফায়ার সার্ভিসকে জানান। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে হেলে পড়া ভবনটির পাশে নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের পাইলিং কাজ বন্ধ করে দেন। একইসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা হেলে পড়া ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বাসিন্দাদের সরিয়ে দিয়ে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০১১ সালে লন্ডন প্রবাসী আমার ভাই রিয়াজুল আমিন অরুণ এই ৫ তলা ভবনটি নির্মাণ করে। সম্প্রতি পাশের জায়গায় গ্রিন ডেভেলপমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করে। কিন্তু পাশে জায়গা না রেখে নিয়ম অমান্য করে পাইলিং করার কারণে আমাদের ৫ তলা ভবনটি হেলে পড়েছে। একইসঙ্গে ভবনের দেয়ালেও ফাটলের রেখা পড়েছে। বিষয়টি ফায়ার সার্ভিসকে অবগত করলে তারা এসে বেজমেন্টের কাজ বন্ধ করে দিয়ে আমাদের ভবনের বাসিন্দাদের সরিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত। কখন কি হয়, আল্লাহ ভালো জানেন।

এ বিষয়ে ফায়ার ফাইটার মো. জাকারিয়া ঢাকা বলেন, পাইলিং করার কারণে পাশের ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পাইলিংয়ের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে হেলে পড়া ভবনটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বাসিন্দাদের সরিয়ে গেট তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে কথা বলে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মানস বিশ্বাস বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এই মুহূর্তে ভবনটি পর্যবেক্ষণে রেখে দুই ভবন মালিককে কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছে। খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ভবন নির্মাণে কাজ করা গ্রিন ডেভেলপমেন্ট সংশ্লিষ্ট কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুস সাকিব বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বর্তমানে হেলে পড়া ভবনটি খালি করে দেওয়া হয়েছে।