ময়মনসিংহ খাদ্য বিভাগের পরিদর্শক শাহ মাজহারুল হক কামালকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ডেপুটেশন, মূল কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া এবং বদলি-বাণিজ্য, ঠিকাদারি, জুয়ার আসর থেকে অর্থ আদায়সহ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তালিকায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, বাড়ি, দোকান, গাড়ি এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্য রয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তে তার আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, ময়মনসিংহ নগরীর ইনডেক্স প্লাজায় ৭সি নম্বর একটি ফ্ল্যাট, আমলাপাড়ার একটি মাদ্রাসার পাশে একটি ফ্ল্যাট এবং দুর্গাবাড়ী রোডে একটি দোকানের মালিকানার সঙ্গে শাহ কামালের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হচ্ছে। কাঁচিঝুলিতে দুই ভাইয়ের নামে ছয়তলা ভবনের ভিত্তির ওপর নির্মিত চারতলা একটি বাড়ি এবং নতুন বাজারের ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার কথাও অভিযোগে রয়েছে।
এ ছাড়া গফরগাঁওয়ের জামতলা মোড়ে একটি দোকান এবং ইমামবাড়ী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন বাজারে একাধিক দোকান থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। ঢাকার উত্তরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস মোড়ে এসএসসি-৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের সম্মিলিত উদ্যোগে কেনা জমিতে তার তিনটি শেয়ার রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
গাড়ির মালিক অন্যজন, ব্যবহার শাহ কামালের
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে একটি টয়োটা প্রিমিও গাড়িও। ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের গাড়িটি ময়মনসিংহ খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক যুবলীগ নেতা আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত হলেও শাহ কামাল এটি ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গাড়িটি মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার গ্যারেজে রাখা হয় বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তবে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহার এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্য, গাড়ির কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বজনদের নামে বিনিয়োগের অভিযোগ
শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের স্ত্রী নূরজাহান বেগম, ছোট ভাই শাহ ইশতিয়াক রুবেল এবং শ্যালক ফাহিমের নামে বিভিন্ন জায়গা ও ব্যবসায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের প্রকৃত উৎস এবং শাহ কামালের সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এ জন্য তার আয়কর নথি, আয়-ব্যয়ের বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব, কোম্পানি বা অন্যান্য বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। একই সঙ্গে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের মাধ্যমে তদন্তের দাবিও উঠেছে।
খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে জুয়ার আসর?
অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার কাঁচাবাজারে গেন্দু মিয়ার হোটেলের পাশে ময়মনসিংহ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে প্রতি রাতে জুয়ার আসর বসে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে শাহ কামাল ‘বিডার’ হিসেবে যুক্ত এবং ওই আসর থেকে প্রতিদিন আনুমানিক এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে জুয়ার আসর বসা, সেখানে শাহ কামালের সংশ্লিষ্টতা এবং অর্থ লেনদেনের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক: ‘খোঁজ নেব’
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ঢাকায় প্রশিক্ষণে আছি। এগুলোর খোঁজ নেব।”
ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) আশরাফুল আলম বলেন, শাহ কামাল তার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তার সময়ে কামালের ডেপুটেশন-সংক্রান্ত কোনো আদেশ হয়নি বলেও জানান তিনি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, “অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযোগ অস্বীকার শাহ কামালের
এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহ মাজহারুল হক কামালের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
অন্যদিকে, গফরগাঁও ও ময়মনসিংহের একাধিক সংবাদকর্মীর অনুসন্ধান এবং খাদ্য বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য-উপাত্তে শাহ কামালের সম্পদ, কর্মস্থল ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আরও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
তবে অভিযোগে উল্লেখ করা সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, বাজারমূল্য, অর্থের উৎস এবং শাহ কামালের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড ও আর্থিক নথি যাচাই করা জরুরি।
তদন্তের দাবি
দীর্ঘদিনের ডেপুটেশন, মূল কর্মস্থলে না ফেরার কারণ, বদলি-বাণিজ্য ও ঠিকাদারদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, কথিত জুয়ার আসর থেকে অর্থ আদায় এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সবকিছু একসঙ্গে খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
তাদের দাবি, শুধু অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে শাহ কামালের চাকরির পুরো কর্মকাল, ডেপুটেশন ও বদলির নথি, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের দলিল, গাড়ির মালিকানা ও ব্যবহার এবং স্বজনদের নামে থাকা সম্পদের অর্থের উৎস যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।