যথাযোগ্য মর্যাদা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহে জুলাই শহিদ দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এর আগে সকালে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস. এম. হুমায়ুন কবির সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। সভার শুরুতে জুলাইয়ের শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার এস. এম. হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, জুলাই কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়; এটি সমগ্র দেশের মানুষের আন্দোলনের ফসল। বৈষম্য দূর করতে হলে ব্যক্তিগত জীবন থেকেই ন্যায়পরায়ণতা ও সততার চর্চা শুরু করতে হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও তা যেন জনদুর্ভোগের কারণ না হয়। অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক উপায়ে দাবি আদায় করতে হবে। পাশাপাশি দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে নিজেদের প্রস্তুত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সফলভাবে বাস্তবায়নে জনগণের সহযোগিতা, গঠনমূলক সমালোচনা ও ইতিবাচক পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উন্নয়ন, সামাজিক সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। জুলাইয়ের প্রকৃত চেতনা হলো অন্যায়, বৈষম্য, দুর্নীতি ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ন্যায়, সমতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
বিশেষ অতিথি সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, জুলাই শুধু বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি ত্যাগ, সাহস, প্রতিরোধ ও জনগণের জাগরণের ইতিহাস। এটি শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগের কাহিনি এবং মুক্তির জন্য রক্তে রঞ্জিত এক গৌরবগাথা। এই ইতিহাস কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি আন্দোলনই জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতিফলন। কোনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ বা আগ্রাসী শক্তি বাংলাদেশের জনগণকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের প্রতিটি দিন, প্রতিটি আত্মত্যাগ এবং প্রতিটি শহীদের স্মৃতি ধারণ করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে শুধু বক্তৃতা বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করতে পারলেই সেই চেতনা টেকসই হবে।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত ডিআইজি রাশিদা বেগম, জুলাই শহীদ মাহিনের বাবা, জুলাই শহীদ সাগরের বাবা, জুলাই যোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা বক্তব্য দেন। এছাড়া বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধি, শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সকাল ১০টায় ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস মোড়ে অবস্থিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এ সময় ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন, বিভাগীয় কমিশনার এস. এম. হুমায়ুন কবির সরকার, জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান এবং জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্যরা পৃথকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ।।