প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:০৫ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা থেকে খাদ্য পরিদর্শক কামালের অঢেল অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ।।

ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের নামে-বেনামে বিপুল অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, গফরগাঁওয়ের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের তদবিরে তাঁর একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে আশীর্বাদপুষ্ট কামাল ২০০০ সালের ২৬ ডিসেম্বর খাদ্য বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন।

চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে ২০২০ সালের জুলাইয়ে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগে ময়মনসিংহের ফুলপুর এলএসডি থেকে তাঁকে প্রত্যাহার করে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলা খাদ্য দপ্তরে পদায়ন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরবর্তীতে তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে যোগ দেন বলে জানা যায়।

ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য পরিদর্শক সমিতির অঘোষিত নিয়ন্ত্রক ও ‘সম্রাট’ হিসেবে তাঁর খ্যাতি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং পরিবহন ঠিকাদারি নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে তদবির-বাণিজ্য করে আসছেন শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাঁর কথামতো কাজ না করলে বিভিন্নভাবে হয়রানি বা ক্ষতির মুখে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল নিজের নামে, স্ত্রী, শ্যালক, মা, ভাইসহ অন্যান্য স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে বিপুল অর্থ-সম্পদ ও বিনিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ময়মনসিংহ নগরীর মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজায় ৭-সি নম্বরের একটি ফ্ল্যাট, আমলাপাড়ায় মাদ্রাসার পাশের একটি ফ্ল্যাট, দুর্গাবাড়ী রোডে একটি দোকান, কাঁচিঝুলিতে দুই ভাইয়ের নামে ছয়তলা ফাউন্ডেশনের চারতলা ভবন এবং নতুন বাজারের ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি ফ্ল্যাট বুকিংয়ের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া গফরগাঁওয়ের জামতলা মোড়ে একটি দোকান এবং ইমামবাড়ী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন বাজারে একাধিক দোকান রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার উত্তরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস এলাকায় এসএসসি-৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের সম্মিলিত উদ্যোগে কেনা জমিতে তাঁর তিনটি শেয়ার রয়েছে বলেও তথ্য সূত্রে জানা গেছে।

ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের একটি টয়োটা প্রিমিও গাড়ি ময়মনসিংহ খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক যুবলীগ নেতা আবু বকর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত হলেও সেটি শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের ক্রয়কৃত এবং তিনিই ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গাড়িটি মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার গ্যারেজে রাখা হয়। তবে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহার ও অর্থের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন।

শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের স্ত্রী নূরজাহান বেগম, শ্যালক ফাহিম, ছোট ভাই শাহ ইশতিয়াক রুবেল, মা এবং অন্যান্য স্বজনের নামে অর্থ-সম্পদ ক্রয়ের উৎস ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল তল্লাশি এবং নামে-বেনামে বিভিন্ন লাইসেন্স খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন খাদ্য বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গফরগাঁওয়ের সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা।

গফরগাঁওয়ের রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল গফরগাঁও সরকারি কলেজ শাখার আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া ও ফখরুল ইসলামের কমিটির নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া গফরগাঁও সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি শাহজালাল সাজুর নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৯৭ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গফরগাঁওয়ে বিএনপির জনসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার পথে গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কামালের নাম আলোচনায় উঠে এসেছিল বলেও রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ দাবি করেন। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকাকালে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর ছবিও রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।

তাঁকে নিয়ে ময়মনসিংহজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের দাবিও উঠেছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অধিকাংশ তথ্য সঠিক নয় এবং মিথ্যা বলে দাবি করেন।

অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসান বলেন, “বিষয়গুলো খোঁজ নিয়ে দেখব।”

ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম বলেন, “অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-১ অধিশাখা) সনজীদা শরমিন জানান, “বিষয়টি নিয়ে একটু ডিজি স্যারের সঙ্গে কথা বলেন। কোনো অভিযোগ থাকলে তাঁরাই দেখবেন।”

চেয়ারম্যান: তানভীর হাসান তপু ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: আতিকুল ইসলাম। বার্তাকক্ষ: newsutvbd@gmail.com. কপিরাইট © ইউটিভি বাংলাদেশ সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন