ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জাল বিএস/বিআরএস খতিয়ান ব্যবহার করে একাধিক জাল দলিল তৈরির অভিযোগে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক হেলাল উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বুধবার তার দলিল লেখার কার্যক্রম স্থগিত করে জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
হেলাল উদ্দিন সরকার ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতলা ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি। তিনি গোয়াতলা বরাটিয়া গ্রামের মৃত কাসম আলী মুন্সির ছেলে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি জালিয়াত চক্র ও সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন হেলাল উদ্দিন। ভুয়া পরিচয়পত্র ও জাল খতিয়ান ব্যবহার করে জমির দলিল তৈরি, জমির মালিকানা পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অনিয়মে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
২০১৯ সালের দলিল নিয়ে অভিযোগ
সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর একটি দলিল তৈরিতে জালিয়াতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সুভাষ চন্দ্র দত্ত স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে হেলাল উদ্দিন সরকারের বক্তব্য, ঘটনাগুলো অনেক আগের হওয়ায় কীভাবে কী হয়েছে, তা এখন তার মনে নেই।
অষ্টম শ্রেণি পাসেই দলিল লেখকের লাইসেন্স!
হেলাল উদ্দিনের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস হলেও কীভাবে তিনি দলিল লেখকের লাইসেন্স পেয়েছেন এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ওই সময়ে সাব-রেজিস্ট্রার আমাকে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’
বিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ
জমি ও দলিলসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি স্থানীয় গোয়াতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি থাকাকালে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১০ সালে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হওয়ার পর লিখিত পরীক্ষায় প্রক্সি প্রার্থী বসিয়ে অন্তত সাত থেকে আটজন শিক্ষক-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লিটন, আকতাব উদ্দিন, মঞ্জু এবং বর্তমান প্রধান শিক্ষক ইসমাইল হোসেনের নিয়োগ নিয়েও অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের মাঠে অনুমোদন ছাড়াই গরুর হাট বসানো এবং দোকানঘর নির্মাণ করে সেখান থেকে পাওয়া অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সম্পদ ও জমি দখলের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, দলিল লেখার কাজ, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন হেলাল উদ্দিন। প্রতিবেশীদের জমি দখল, জমির সীমানা বাড়িয়ে নেওয়া এবং প্রভাব খাটিয়ে বিরোধপূর্ণ জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের দাবি, এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলা ও ভয়ভীতি দেখানো হতো।
ছেলের বিরুদ্ধেও মাদক মামলার অভিযোগ
হেলাল উদ্দিনের ছেলে মোকামেল মিয়ার বিরুদ্ধেও মাদকসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি ইউনিয়ন যুবলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোকামেলের দ্বিতীয় স্ত্রী নুরজাহানের বিরুদ্ধেও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘তখনকার সরকারের সময় অনেক কিছু করতে হয়েছে’
অভিযোগের বিষয়ে হেলাল উদ্দিন সরকার বলেন, ‘অনেক আগের বিষয়। কীভাবে কী হয়েছে, এখন আমার কিছুই মনে নেই।’
অষ্টম শ্রেণি পাস হয়ে কীভাবে দলিল লেখকের লাইসেন্স পেয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওই সময়ে সাব-রেজিস্ট্রার আমাকে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি থাকা অবস্থায় অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তখনকার সরকারের সময় অনেক কিছু করতে হয়েছে। এখন আমাকে দোষী বানানো হচ্ছে।’
‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা’
ধোবাউড়ার সাব-রেজিস্ট্রার আজমেরী নির্ঝর বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে দলিল লেখক হেলাল উদ্দিন সরকার ও জাহাঙ্গীর আলম খানের দলিল লেখার কার্যক্রম বুধবার প্রাথমিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. সালমান ওমর রুবেল বলেন, ‘আমার কাছে ভুক্তভোগী অভিযোগ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে দলিল লেখকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার রেকর্ড পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ।।