জাল সনদ, প্রশাসনিক অনিয়ম ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগে রাজধানীর দনিয়া কলেজ এবং বর্ণমালা আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ইমরান আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। একই ধরনের অভিযোগের পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দনিয়া কলেজের সভাপতির পদ থেকে তাকে সরিয়ে দিলেও ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন বর্ণমালা আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে তিনি কীভাবে সভাপতির দায়িত্বে বহাল রয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না করেও ইমরান আহমেদ বিতর্কিত ইবাইস ইউনিভার্সিটির বিবিএ ও এমবিএ সনদ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে সভাপতির পদে থাকার যোগ্যতা দেখিয়েছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত প্রতিবেদনে ইবাইস ইউনিভার্সিটির কার্যক্রম ও পরবর্তী সময়ে দেওয়া সনদের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, এসব অভিযোগের পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গত ২৯ জুলাই ২০২৬ ইমরান আহমেদের মনোনয়ন বাতিল করে দনিয়া কলেজের সভাপতি পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন তারেককে নিয়োগ দেয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই ইমরান আহমেদ পুনরায় ওই পদে কীভাবে বহাল হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দনিয়া কলেজের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত ৪ আগস্টের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ঢাকা কলেজের অধ্যাপক ড. মোসা. আখতারা বানুকে দনিয়া কলেজে প্রেষণে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করে ইমরান আহমেদপন্থী পক্ষ আদালতে রিট করে। ফলে মন্ত্রণালয়ের আদেশ কার্যকর হওয়া নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে অনিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, বর্ণমালা আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজেও ইমরান আহমেদের সভাপতির পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দনিয়া কলেজের ক্ষেত্রে যেসব নথি ও যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি উঠেছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়েও শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠানটিতে তার সভাপতির পদে থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়নি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে অবস্থানকালেও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে তার স্বাক্ষর ব্যবহৃত হয়েছে। গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে তার স্বাক্ষরযুক্ত একটি নথির মাধ্যমে জুন মাসের বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। এ ক্ষেত্রে তিনি সংশ্লিষ্ট সময়ে দেশে ছিলেন কি না, স্বাক্ষরটি কীভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং বেতন বিলের অনুমোদন প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকদের কেউ কেউ।
অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথাও জানা গেছে। তবে অভিযোগ পাওয়ার পর ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একই ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা, সনদের বৈধতা ও প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে এক প্রতিষ্ঠানে প্রশ্ন উঠলেও অন্য প্রতিষ্ঠানে তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তে এমন পার্থক্যের কারণ কী -এ নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অভিযোগগুলোকে ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই, সনদের বৈধতা পরীক্ষা, আর্থিক লেনদেনের নিরীক্ষা এবং গভর্নিং বডির বৈধতা খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর মুনসী হুমায়ূন কবিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দীন আহমেদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এম. আনোয়ার হোসেন।।