দেশের প্রশাসনিক হৃদপিণ্ড বাংলাদেশ সচিবালয়ে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবার মারাত্মক কারিগরি গাফিলতি এবং জরাজীর্ণ দশা উন্মোচিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ের স্পর্শকাতর ভবনগুলোতে দিনের পর দিন পড়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ কেবিনেট তারের জটলা এবং অরক্ষিত নেটওয়ার্ক সংযোগের কারণে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে প্রধানমন্ত্রী এবং শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কিংবা যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে গভীর কোনো চক্রান্ত রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিটিসিএলের অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সচিবালয়ের নতুন ১নং ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০টি ফ্লোরজুড়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জিপোনের এমডিইউ, অপটিক্যাল ফাইবার এবং সাধারণ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রিক ক্যাবল একই ডাক্টের ভেতরে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। বিপজ্জনকভাবে ফাইবার ও বিদ্যুতের লাইন একসাথে থাকায় সামান্য বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটেই পুরো ভবনের যোগাযোগ ব্যবস্থা মুহূর্তের মধ্যে অচল হয়ে পড়তে পারে। সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি মন্ত্রণালয় ধারণকারী ৬ নম্বর ভবন, বাণিজ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ধারণকারী ৩ নম্বর ভবনের টেলিফোন কেবিনেটের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এছাড়া স্বরাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয় ধারণকারী ৮ নম্বর ভবনের সামনে কেবিনেট থেকে ১১ নম্বর ভবনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দিকে যাওয়া টেলিফোন ও ডেটা লাইনগুলোর তারের জট দেখলে মনে হবে এটি দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, বরং কোনো পরিত্যক্ত স্থাপনা। ৬ নং ভবনের নিচতলায় কেবিনেটগুলোও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
অভিযোগ রয়েছে, কেবিনেটগুলোর ভেতর যেন এক মাকড়সার জাল। ধূলোবালি, মরিচা ও জট পাকানো রঙিন তারের ভিড়ে কোন লাইন কোথায় গেছে তা খুঁজে পাওয়াই দায়। কেবিনেটে নিরাপত্তা কিংবা সুশৃঙ্খল ক্যাবল ম্যানেজমেন্টের কোনো অস্তিত্ব নেই। অনেক ক্ষেত্রে স্যাঁতসেঁতে কাপড়ের টুকরো ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ক্যাবল স্প্লাইসিং করে রাখা হয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা বলয়ে এমন মারাত্মক কারিগরি গাফিলতি স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয় বলে মনে করছেন নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা। এটি কি নিছকই অবহেলা, নাকি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষতিসাধন বা বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটানোর জন্য পরিকল্পিত কোনো চক্রান্ত, তা নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
বিটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থানে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে প্রতি বছর মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বিপুল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে সেই খাতের টাকার সিংহভাগই কাগজ-কলমে খরচ দেখিয়ে আত্মসাৎ করছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জহুরুল ইসলামের মদদপুষ্ট বিটিসিএল-এর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ডিজিএম আনোয়ার পারভেজ এবং সহকারী ম্যানেজার মুরাদ হোসেন। এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মেইনটেন্যান্স ও সংস্কার কাজের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোটি কোটি টাকা পকেটে পুরার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিটিসিএলের এই সিন্ডিকেট নিয়মিত সংস্কার কাজ না করে জরাজীর্ণ কেবিনেট ফেলে রাখার ফলে সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি পুরো সচিবালয় মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সেই সাথে সরকারের কোষাগারের বিপুল অর্থ লুটপাট হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত ডিজিএম আনোয়ার পারভেজ ইতিপূর্বে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী দপ্তরে সংযুক্তিতে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তার নানা প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হলে তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে বিটিসিএলে ফেরত পাঠানো হয়। তাছাড়া নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অভিযূক্ত সহকারী ম্যানেজার মুরাদ মুস্তাকিম নামের এক তরুণকে অবৈধভাবে কনিষ্ঠ লাইনম্যান বানিয়ে সচিবালয়ের মতো সুরক্ষিত জায়গায় প্রবেশের সুযোগ করে দেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কাজ করার জন্য তাকে বিশেষ প্রবেশাধিকার বা গ্রীন কার্ড পাইয়ে দেওয়ার জালিয়াতিও করেন। পরবর্তীতে জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ পেলে মুস্তাকিমকে প্রত্যাহার করা হলেও এখনও তাকে মাঝে মাঝে সচিবালয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সচিবালয় দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত স্থান। এখানকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ অন্যান্য জরুরি মন্ত্রণালয়ের টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা যদি এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ কেবিনেটের ওপর নির্ভর করে, তবে তা শুধু প্রশাসনিক স্থবিরতাই নয়, বরং নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্নীতিবাজ চক্রের বিচার এবং ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগগুলো আধুনিকায়ন করা না হলে বিপজ্জনকভাবে ফাইবার ও বিদ্যুতের লাইন একসাথে থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটেই পুরো ভবনের যোগাযোগ ব্যবস্থা মুহূর্তের মধ্যে অচলাবস্থা হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে বিটিসিএলের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিশেষ প্রতিনিধি।।