ময়মনসিংহের গফরগাঁও-মাওনা সড়ক প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত বিভিন্ন মৌজায় ভুয়া কাগজপত্র, কৃত্রিম স্থাপনা ও অধিগ্রহণের সীমানার বাইরে থাকা স্থাপনা দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের সরকারি ক্ষতিপূরণ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, চক্রটির সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমের সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকদের অভিযোগ, দ্রুত ক্ষতিপূরণের টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ভূমি ও স্থাপনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে দালাল চক্র। পরে কৌশলে ৮ ধারার নোটিশে নিজেদের বা নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে কৃত্রিম স্থাপনা ও কথিত ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। এতে প্রকৃত ভূমির মালিকেরা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গফরগাঁও-মাওনা সড়ক প্রকল্পের ২০২৪ সালের এলএ কেস নম্বর-১০-এর আওতাধীন তললি মৌজায় একটি মুরগির খামার দেখিয়ে প্রায় ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভূমি অধিগ্রহণের আগে সেখানে ওই খামারের অস্তিত্ব ছিল না। অধিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ কার্যক্রমের সময় রাতারাতি বাঁশ দিয়ে খামারটি তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ঘটনায় ভূমির মালিক হাদিউল এবং দালাল হিসেবে অভিযুক্ত ফেরদৌসসহ একটি চক্র জড়িত। তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একই প্রকল্পের পুরাদিয়ারটেক মৌজায় একটি ডিপ টিউবওয়েলের ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় দেড় কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়ায় ফেরদৌস ও নুরুল আমিনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নাম রয়েছে। অন্যদিকে একই প্রকল্পের সাদুয়া মৌজায় আরেকটি ডিপ টিউবওয়েলের জন্য ৫০ লাখ টাকার কম ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই ধরনের স্থাপনার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের অঙ্কে এত বড় ব্যবধান কেন তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফেরদৌস, জালাল মাস্টার, কামরুল, আক্তারুল আলমসহ কয়েকজন এবং পাঁচ নারীসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চক্রটি প্রথমে প্রকৃত ভূমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে নানা জটিলতা ও হয়রানির ভয় দেখায়। এরপর আগাম অর্থের বিনিময়ে দালালদের নিজেদের লোক বা অংশীদার হিসেবে দেখিয়ে ভূমি ও স্থাপনার কাগজপত্র তৈরি করা হয়।
পরবর্তী সময়ে এসব কাগজপত্রের ভিত্তিতে ৮ ধারার নোটিশে দালাল চক্রের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ। এরপর কৃত্রিম স্থাপনা, পুকুর, জলাশয়, খাল ও অন্যান্য অবকাঠামো দেখিয়ে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এবং তা উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন মৌজায় একই কৌশলে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কিছু অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটি ফাইল হালনাগাদ করে ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শুধু ভুয়া কাগজপত্র বা কৃত্রিম স্থাপনাই নয়, প্রকল্পের অধিগ্রহণের সীমানার বাইরে থাকা স্থাপনা, পুকুর ও জলাশয়কে অধিগ্রহণের আওতাভুক্ত দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের মূল নকশা, অধিগ্রহণের সীমানা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র মিলিয়ে দেখা হলে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের আগে ও পরে স্থাপনার ছবি, পরিমাপের নথি এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাচাই করলেই কথিত কৃত্রিম স্থাপনা তৈরির বিষয়টিও স্পষ্ট হতে পারে।
সচেতন মহলের মতে, ভূমি অধিগ্রহণের ৮ ধারার নোটিশ, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের তালিকা, চেক বিতরণের রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে কারা ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছেন, তার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গফরগাঁও-মাওনা সড়ক প্রকল্পেই শুধু নয়, ময়মনসিংহ ও গাজীপুর জেলার অতীতের বিভিন্ন ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পেও একই ধরনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল।
তাদের ভাষ্য, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে নানা হয়রানি ও জটিলতার ভয় দেখিয়ে দালাল চক্র তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। পরে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন বা অংশীদার হিসেবে নিজেদের লোকদের কাগজপত্রে অন্তর্ভুক্ত করে ক্ষতিপূরণের অর্থের অংশ নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও দালালদের নাম ৮ ধারার নোটিশে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের নামেই চেক হস্তান্তর করা হয়েছে।
এতে প্রকৃত মালিকেরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের অর্থেরও ব্যাপক অপচয় হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কথিত দালাল চক্র নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে। তাদের নাম ভাঙিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। ফলে সাধারণ ভূমির মালিকদের মধ্যে এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী হয়রানি বা ক্ষতির আশঙ্কায় প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও সাহস পান না বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্তদের। এতে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিক ও সচেতন মহলের দাবি, গফরগাঁও-মাওনা সড়ক প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম নিয়ে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তের আওতায় আনতে হবে ৮ ধারার নোটিশ, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের প্রক্রিয়া, স্থাপনার মূল্যায়ন, চেক বিতরণের তালিকা, ব্যাংক লেনদেন এবং প্রকল্পের অধিগ্রহণের মূল নকশা।
একই সঙ্গে অধিগ্রহণের সীমানার বাইরে থাকা কোনো স্থাপনা বা জলাশয়কে ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা হয়েছে কি না, কৃত্রিম স্থাপনা তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে কি না এবং প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে অন্য কেউ ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছেন কি না এসব বিষয়ও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তি, দালাল চক্র এবং তাদের সহযোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আত্মসাৎ বা অপচয় হওয়া সরকারি অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে, ভূমি অধিগ্রহণ অফিসে দালালদের ব্যাপারে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানানো হলেও অভিযোগে উল্লিখিত কয়েকজনকে ওই অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করতে দেখা যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমানে বদলিজনিত কারণে অন্যত্র কর্মরত থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি, ভূমি অধিগ্রহণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। গফরগাঁও-মাওনা সড়ক প্রকল্পের অন্যান্য মৌজায় ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে অসঙ্গতি এবং কথিত দালাল চক্রের তৎপরতার তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

শিবলী সাদিক খান।।