পুরনো ঢাকায় সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মামুনের বিরুদ্ধে দখলবাণিজ্য ও চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রভাব বিস্তার করে নবাবপুর, ফুলবাড়িয়া ও সিদ্দিক বাজার এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নবাবপুর এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শুভ বসাক তার ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমিতে নির্মাণকাজ শুরু করলে মামুনের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী তার কাছে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। এ ঘটনায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামুনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার সিআর নম্বর ১৯৩৪/২০২৪ এবং এতে পেনাল কোডের ৩২৩/৩৭৯/৩৮৫/৩৮৭/৪২৭/৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘শরীফ আদমী’র পরিচয়ের আড়ালে মামুন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন। তিনি বংশাল থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক পদ ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন বলেও সমালোচনা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে কথা বলতে স্থানীয়রা ভয় পান বলেও অভিযোগ ওঠে।
জানা গেছে, তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং নবাবপুর দোকান মালিক সমিতির স্বঘোষিত সভাপতি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে মামুন ও তার ঘনিষ্ঠরা জাকের সুপার মার্কেট, সিটি প্লাজা ও নগর প্লাজাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকান বরাদ্দ, ভাড়া নির্ধারণ ও পুনর্বিন্যাসের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মামুনের ভাই ফারুক, কাশ্মীর লিটন, শুক্কুর, মনু ও মোক্তার হোসেনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শুধু মার্কেট নয়, পরিবহন খাতেও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণবঙ্গগামী বিভিন্ন পরিবহন—ইমাদ পরিবহন, গোল্ডেন লাইন, ইলিশ, দোলা, প্রচেষ্টা, মহানগর, আনন্দ, মাওয়া এক্সপ্রেস, তাহসিন এন্টারপ্রাইজ, স্বাধীন এন্টারপ্রাইজ, নবকলি এক্সপ্রেস, টুঙ্গীপাড়া এক্সপ্রেস, বসুমতী ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড ও গাংচিল এক্সপ্রেস থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।
এছাড়া ফুলবাড়িয়ার ১৪/১ কাজী আবদুল হামিদ লেনের আল হায়াত ম্যানসন মার্কেট এবং সিদ্দিক বাজারের টুকু টাওয়ার মার্কেট নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের তিনদিন পর সন্ত্রাসীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এসে শুভ বসাকের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এ সময় শুভ বসাক অচেতন হয়ে পড়লে তার কাছে থাকা ১ লাখ ৭ হাজার টাকা ও দুই ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইন নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনার বিচার দাবিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালিত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ২০১০ সালে তৎকালীন কাউন্সিলর ও যুবদল নেতা হাজি আহম্মদ হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর মামুনের উত্থান ঘটে। এর আগে তিনি আহম্মদ হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
এদিকে, সম্প্রতি দৈনিক লাল সবুজের দেশ ও পাক্ষিক অপরাধ জগত ম্যাগাজিনের সাংবাদিক এবং বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ইউনিয়নের ঢাকা মহানগর শাখার কল্যাণ সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ মামুনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মামুন সাংবাদিক রিয়াজ আহমেদের বিরুদ্ধে বংশাল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১২৪৮, তারিখ ২৩/০৪/২০২৬) করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালান।
স্থানীয়দের দাবি, দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তারা বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বললেও রাজধানীতে এমন কর্মকাণ্ড দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা।।