ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা ভূমি অফিসের চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম ও সেবা গ্রহীতাদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর উঠেছে অফিসের সার্ভেয়ার জহিরুল ইসলাম, উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন, সার্টিফিকেট পেশকার খাইরুল ইসলাম এবং মিউটেশন সহকারী সাজ্জাদ হোসেনের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, খতিয়ান সৃজন, তদন্ত প্রতিবেদন, নামজারি ও অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের উৎকোচ না দিলে কাজ করা হয় না। টাকা না দিলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে মনগড়া তথ্য দিয়ে সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, সার্ভেয়ার জহিরুল ইসলাম ভালুকা ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই নানা অনিয়মের মাধ্যমে সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছেন। কাগজপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে তিনি প্রতিবেদনে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করে নানা কৌশলে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন।
উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, হবিরবাড়ী মৌজায় তার পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত জমি ভুলবশত রেকর্ড হওয়ায় সংশোধনের জন্য সার্ভেয়ারের কাছে গেলে তিনি মোটা অঙ্কের উৎকোচ দাবি করেন।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব সার্ভেয়ারের ওপর পড়লে তিনি তার কাছে ঘুষ দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমির কাগজপত্র সঠিকভাবে পর্যালোচনা না করেই প্রতিপক্ষের পক্ষে একতরফা প্রতিবেদন দাখিল করেন।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলার ভরাডোবা ইউনিয়নের একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়েও। অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীর কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করেই সার্ভেয়ার অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে প্রকৃত জমির মালিক ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন।
কাচিনা ইউনিয়নের এক সেবাগ্রহীতা জানান, জমির নামজারি খতিয়ান করতে গিয়ে সার্ভেয়ারের কাছে গেলে তাকে বলা হয় রেকর্ডীয় মালিকের জমি নেই। তিনি বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করলে সার্ভেয়ার বালাম খুলে দেখান যে বিক্রেতার নামে গোল চিহ্ন রয়েছে। পরে উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন তাকে জানান, এক লাখ ৪০ হাজার টাকা দিলে ওই গোল চিহ্ন তুলে দেওয়া যাবে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সার্ভেয়ার জহিরুল ইসলাম অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে একজনের দখলীয় জমি অন্যজনকে পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেন। তার চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলে তদন্ত প্রতিবেদন বিপক্ষে চলে যায়। এতে এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধ ও উত্তেজনা বাড়ছে।
কাদিনগর, পালাগাও ও তামাট এলাকার কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, সার্ভেয়ার যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ভিপি সম্পত্তি নিয়েও বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, তার সহযোগীদের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ তৈরি করে উভয় পক্ষের কাছ থেকেই অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে এলাকায় জমি নিয়ে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভালুকা উপজেলা ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো সেবা পাওয়া যায় না—এমন অভিযোগ তুলেছেন অনেক সেবাপ্রত্যাশী। জমির নামজারি, খতিয়ান দেখা, তদন্ত প্রতিবেদন বা খাজনা আদায়—প্রতিটি ধাপেই অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ।
সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহের সময় পরিচয় গোপন রেখে কথা বললে একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করার চেষ্টা করলেও সার্ভেয়ার জহিরুল ইসলাম, উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন, সার্টিফিকেট পেশকার খাইরুল ইসলাম ও মিউটেশন সহকারী সাজ্জাদ হোসেনের মতো কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার কারণে অফিসের বদনাম কাটছে না। তাদের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কোনো ফাইলই এসিল্যান্ডের টেবিলে যায় না বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, একটি মিউটেশনের সরকারি ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা হলেও বাস্তবে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। মিউটেশন সহকারী সাজ্জাদ হোসেনের মাধ্যমে এসব অর্থ আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
সেবাগ্রহীতাদের দাবি, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা কয়েকজন দালালের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অফিস খরচের অজুহাত দেখিয়ে নিজেরাই অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন।
এ বিষয়ে একজন সামাজিক বিশ্লেষক বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন চালু হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এখনও সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি পুরোপুরি দূর হয়নি। কেন্দ্রীয়ভাবে সংস্কারের উদ্যোগ থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সেই বার্তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
ভুক্তভোগীরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ইউটিভি ডেস্ক রিপোর্ট।।